ঢাকা, শনিবার, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২৫ মে ২০২৪, ১৬ জিলকদ ১৪৪৫

বিএনপি

নির্বাচনমুখী খালেদা

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩৩২ ঘণ্টা, নভেম্বর ১২, ২০১৭
নির্বাচনমুখী খালেদা জনসভায় বক্তৃতা করছেন খালেদা জিয়া। ছবি: ডিএইচ বাদল

ঢাকা: দীর্ঘ ঊনিশ মাস পর জনসভায় এসে টানা এক ঘণ্টা বক্তৃতা করলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এই বক্তৃতায় তিনি যেমন আবেগ তাড়িত হয়েছেন, তেমনি আগামী নির্বাচন নিয়ে দিয়েছেন নানা ইঙ্গিত।

তিনি বুঝিয়েছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য কতোটা মুখিয়ে আছেন তিনি ও তার দল। আর এজন্যই সুর নরম করে পরামর্শ দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনকে।

আবার দলীয় নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা করতে দিয়েছেন রাজনৈতিক বক্তব্য। আর দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেছেন আগাম নির্বাচনী ইশতেহার। যাতে ছিলো সুনির্দিষ্ট ভিশন। কর্মসংস্থান, কৃষি, শিক্ষা, উন্নয়ন নিয়ে স্পষ্ট ভিশন ঘোষণা করেছেন তিনি।
 
বিএনপি ক্ষমতায় গেলে জনগণ কি পাবে সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে সারাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। ঘরে ঘরে চাকরি দেয়া হবে। এক বছর বেকার থাকলে বেকার ভাতা দেয়া হবে। শিক্ষিত যুবকদের চাকরির নিশ্চয়তা দেয়া হবে। নারী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সকল শিক্ষা অবৈতনিক করা হবে। স্বাস্থ্যবিমা চালু করা হবে। কৃষকদের জন্য সার-ওষুধ সুলভ করা হবে। ন্যায্য দরে কৃষিপণ্য কিনে নেয়া হবে। দরিদ্র ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কৃষি ঋণ মওকুফ করা হবে। গ্রামে কর্মসংস্থান করা হবে, যাতে গ্রামের মানুষকে শহরে আসতে না হয়। গ্রামের মানুষ গ্রামে থেকেই গ্রামের উন্নয়ন করবে। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো হবে। যদিও এ বছরের প্রথমার্ধেই এমন একটি ‘ভিশন ২০৩০’ ঘোষণা করেছিলেন খালেদা জিয়া।
 
দীর্ঘ বিরতির পর বিশাল জনসভায় বক্তব্য দিতে উঠে অনেকটাই উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন খালেদা জিয়া। বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে তাই মঞ্চের সামনে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে মজাও করেছেন তিনবারের এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী, যা তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে একেবারেই অপরিচিত। এ সময় তিনি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়েও কথা বলেন।
 
সরকারি কর্মীদের ভয়ের কিছু নেই
খালেদা জিয়া বলেন, অনেকেই বলছেন বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি যাবে, জেল জরিমানা হবে। আমরা ক্ষমতায় গেলে দলমত নির্বিশেষে দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি দেয়া হবে। সরকারি চাকরি যারা করেন তাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আমরা জানি ও বুঝি তারা সরকারের হুকুম পালন করেন মাত্র। তাই তাদের ওপর কোনো প্রতিহিংসা দেখানো হবে না। তারা নির্ভয়ে কাজ করবেন। আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতি করি না। মানুষ হত্যার রাজনীতি করি না। এই দেশই আমার একমাত্র ঠিকানা। এদেশের মানুষই আমার বড় ও একমাত্র শক্তি।
 
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যে তিনি  বলেন, এই সরকার তাদের নিয়োগ দিয়েছে। তারা সরকারের কথা শুনবে এটা ঠিক। তবে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। নির্বাচন নিয়ে ইসি সরকারের কোনো অন্যায়কে প্রশয় দিতে পারে না। আগামী নির্বাচন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হতে হবে, ইভিএম বন্ধ করতে হবে, ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। সেনাবাহিনীকে ক্ষমতা দিতে হবে যাতে তারা কাজ করতে পারে। সেনাবাহিনী না দেওয়া হলে ক্ষমতাসীন দল কেন্দ্র দখল করে মানুষের উপর অত্যাচার চালাবে। ভোট চুরি করবে। হাসিনার অধীনে কোন নির্বাচনে জনগণ অংশ নেবে না।
 
সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা পাচার
বিএনপি চেয়ারপারসন অভিযোগ করে বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলেই শেয়ার বাজার লুট হয়। এর আগে কখনো শুনিনি সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের মানুষের টাকা আছে। এই সরকারের এমপি-মন্ত্রীরা জনগণের রক্ত চুষে টাকা চুরি করে বিদেশে পাচার করেছেন।
 
২০১৫ সালে শুধু এক বছরে এই সংখ্যা বেড়েছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া গত ১০ বছরে (২০০৮ - ২০১৭) আওয়ামী লীগ সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। এটা আমাদের হিসাব নয়, আমেরিকা-ভিত্তিক একটি কোম্পানির হিসাব। আওয়ামী লীগের পদে পদে দুর্নীতি। পাচার করা বিপুল অংকের টাকার খবর পানামা পেপারসে এসেছে। দুদক কিন্তু এই কেলেংকারি নিয়ে কোনো মামলা বা তদন্ত করেনি। অথচ দুদক পড়ে আছে আমাদের পেছনে।
 
একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্য দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, গত সাত বছরে চুরি হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। বুঝতেই পারছেন ব্যাংকগুলোর কি অবস্থা! এ খাতের দুর্নীতির সঙ্গে কারা জড়িত মানুষ তা জানে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকা কারসাজি করে পাচার করা হয়েছে। কিন্তু এগুলো নিয়ে কোনো তদন্ত হয় না। কাউকে ধরা হয়নি। জনগণের টাকা এভাবে পাচার হচ্ছে, অথচ এর কারণে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি, বিচার হয়নি। এগুলো তো আওয়ামী লীগের টাকা নয়, জনগণের টাকা। এদেশের মানুষ বাঁচলো কি মরলো তা নিয়ে তাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই।
 
রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য চাপ দিন
রোহিঙ্গা সমস্যা ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলার আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা জাতীয় সমস্যা। এ সমস্যা ঐক্যবদ্ধ হয়ে মোকাবেলা করতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে বলবো, রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য চাপ দিন। শুধু ফেরত পাঠালে হবে না, অত্যাচার নিপীড়ন যাতে না করা হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক, ওই দেশের নাগরিকত্ব দিতে হবে। আমরা মানবিকতার কারণে আশ্রয় দিয়েছি। এভাবে বেশিদিন চলতে পারে না।  
 
সরকারের উন্নয়নের সমালোচনা

খালেদা জিয়া বলেন, সরকার কথায় কথায় উন্নয়নের কথা বলে। উন্নয়নের নামে লুটপাট চলছে। ইউরোপ, আমেরিকার চেয়ে রাস্তা ব্রিজ বানানোর জন্য চারগুণ বেশি ব্যয় হচ্ছে। চলছে নানারকম ধাপ্পাবাজি।
 
বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে, কিন্তু মানুষ বিদ্যুৎ পায় না। গুলশানের মতো জায়গায়ও বিদ্যুৎ আসে যায়। কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট করা হলো, তাহলে মানুষ বিদ্যুৎ পায় না কেন? কুইক রেন্টালের যন্ত্রপাতি বন্ধ হয়, আবার চলে। দায়মুক্তি করা হয়েছে। পদে পদে ধোঁকাবাজি। দীর্ঘদিন ধরে এই ধোঁকাবাজি, অত্যাচার, নির্যাতন চলতে পারে না।
 
জনসভায় আরো বক্তৃতা করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও সিনিয়র নেতারা।
 
বাংলাদেশ সময়: ১৯২৫ ঘণ্টা, নভেম্বর ১২, ২০১৭
আরএম/এমআইএইচ/এমসি/এএম/জেডএম

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।