ঢাকা, শুক্রবার, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২৪ মে ২০২৪, ১৫ জিলকদ ১৪৪৫

বাজেট

৫২ বছরে বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় হাজার গুণ

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৯৩৯ ঘণ্টা, জুন ১, ২০২৩
৫২ বছরে বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় হাজার গুণ

ঢাকা: জাতীয় সংসদে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এটি দেশের ইতিহাসে ৫২তম বাজেট।

 

১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন তাজউদ্দীন আহমদ। সেবার বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। আর আজ বৃহস্পতিবার (১ জুন) প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।  

প্রথম বাজেটের তুলনায় এই বাজেটের আকার বেড়েছে ৯৬৯ গুণ। প্রস্তাবিত এই বাজেট পাস হবে ২৬ জুন। ১ জুলাই শুরু হচ্ছে নতুন অর্থবছর।  

এটি আওয়ামী লীগ সরকারের তৃতীয় মেয়াদের টানা ২৪তম বাজেট, আর বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের পঞ্চম বাজেট।

এবার ‘উন্নয়নের অভিযাত্রায় দেড় দশক পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে’ শিরোনামে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে  ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।  

চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ছিল ৬ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত বাজেট থেকে ১ লাখ ১ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা বেশি।  

প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছর ছিল ২ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা।  

প্রস্তাবিত বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি (অনুদান ব্যতীত) ধরা হচ্ছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয় ২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৭ টাকা।  

মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছর ছিল ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৬ শতাংশ।

২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটটি হবে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে প্রথম বাজেট। এবারের বাজেটে সঙ্গত কারণেই স্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থবছরের পুরো সময় জুড়েই থাকবে সরকারের নানা ধরনের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং বাড়ানো হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা।

এবারের বাজেটের মূল দর্শন হলো ২০৪১ সালের মধ্যে সুখী-সমৃদ্ধ উন্নত স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ। যুদ্ধ ও মহামারি আক্রান্ত অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়ন, নির্বাচনী বছরের চাপ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখা, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, বাজেট ঘাটতির অর্থায়ন, উন্নয়ন কর্মসূচি চলমান রাখাসহ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার মতো নানামুখী চাপের মধ্যে এই স্মার্ট ইকোনমির বাজেট প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১২ অর্থমন্ত্রী (অথবা অর্থ উপদেষ্টা অথবা সামরিক শাসক) বাজেট পেশ করেছেন। তাজউদ্দীন আহমেদ ১৯৭২-৭৩, ১৯৭৩-৭৪ ও ১৯৭৪-৭৫, ড. আজিজুর রহমান ১৯৭৫-৭৬, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৬-১৯৭৭, ১৯৭৭-৭৮ ও ১৯৭৮-৭৯, ড. এম এন হুদা ১৯৭৯-৮০, এম. সাইফুর রহমান ১৯৮০-৮১ ও ১৯৮১-৮২ ও ১৯৯১-৯২, ১৯৯২-৯৩, ১৯৯৩-৯৪, ১৯৯৪-৯৫, ১৯৯৫-৯৬ পর্যন্ত ৫ বার এবং ২০০২-০৩, ২০০৩-০৪, ২০০৪-০৫, ২০০৫-০৬, ২০০৬-০৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন।  

এম সায়েদুজ্জামান ১৯৮৪-৮৫, ১৯৮৫-৮৬, ১৯৮৬-৮৭ ও ১৯৮৭-৮৮, মেজর জেনারেল এম এ মুনিম ১৯৮৮-৮৯ ও ১৯৯০-৯১, ড. ওয়াহিদুল হক ১৯৮৯-৯০, শাহ্ এএমএস কিবরিয়া ১৯৯৬-৯৭, ১৯৯৭-৯৮, ১৯৯৮-৯৯, ১৯৯৯-২০০০, ২০০০-০১ ও ২০০১-০২ এবং ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম ২০০৭-০৮ ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেন।

আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত একটানা ১০ বার বাজেট পেশ করেন। এর আগে তিনি ১৯৮২-৮৩ ও ১৯৮৩-৮৪ দুই অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছিলেন।

মুস্তফা কামাল ২০১৯ সালের ১৩ জুন তার প্রথম বাজেট (২০১৯-২০ অর্থবছর) উপস্থাপন করেছিলেন। ২০২০ সালের ১১ জুন উপস্থাপন করেন দ্বিতীয় বাজেট। ২০২১ সালের ৩ জুন উপস্থাপন করেন তৃতীয় বাজেট। ২০২২ সালের ৯ জুন উপস্থাপন করেন ৪র্থ বাজেট। ২০২৩ সালের ১ জুন উপস্থাপন করেন পঞ্চম বাজেট।

সংসদে সমান ১২ বার বাজেট পেশ করে রেকর্ড করেন প্রয়াত এম সাইফুর রহমান এবং আবুল মাল আবদুল মুহিত। তবে টানা ১০টি বাজেট দেওয়ার রেকর্ড শুধু প্রয়াত মুহিতের। শেখ হাসিনার সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে টানা ১০টিসহ মোট ১২টি বাজেট পেশ করেছেন মুহিত। এর আগে তিনি এইচ এম এরশাদের সামরিক সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে ১৯৮২-৮৩ ও ১৯৮৩-৮৪ এই দুই অর্থবছরের বাজেট দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের বাজেট উপস্থাপনে একটি স্থানে এখনও অনন্য তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি ছিলেন দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ রাজনীতিবিদ, যিনি সংসদে বাজেট উপস্থাপন করেছেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী মোট যে ১৩ জন অর্থমন্ত্রী বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা সংসদে বাজেট উপস্থাপন করেছেন, তারা ছিলেন হয় অবসরপ্রাপ্ত আমলা, সেনা কর্মকর্তা অথবা অর্থনীতিবিদ বা ব্যবসায়ী। তারা কেউই পরিপূর্ণ রাজনীতিবিদ ছিলেন না।

এক অর্থবছরে দুবার বাজেট উপস্থাপনের উদাহরণও আছে বাংলাদেশে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন। এর পর নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব নিয়ে মূল আর্থিক কাঠামো ঠিক রেখে নতুন করে বাজেট উপস্থাপন করেন শাহ এ এম এস কিবরিয়া।

বাজেট যে শুধু অর্থমন্ত্রী বা অর্থ উপদেষ্টা দিয়েছেন, তা নয়। জিয়াউর রহমান সামরিক শাসক হিসেবে তিনটি বাজেট উপস্থাপন করেন। তাজউদ্দীন আহমদ তিনটি, শাহ এএমএস কিবরিয়া ছয়টি, এম সাইদুজ্জামান চারটি বাজেট দেন। অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম দুটি এবং ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ একটি বাজেট পেশ করেন। এরশাদ সরকারের দুই অর্থমন্ত্রী এম এ মুনিম দুটি এবং ওয়াহিদুল হক একটি বাজেট উপস্থাপন করেন।

বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে মীর্জা নুরুল হুদা একটি বাজেট দেন। খন্দকার মোশতাক সরকারের আমলে দেশের প্রথম টেকনোক্র্যাট অর্থমন্ত্রী হিসেবে ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের বাজেট দেন এ আর মল্লিক।

চার মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের চারজন অর্থমন্ত্রী ২১টি বাজেট দিয়েছেন। বিএনপির তিন মেয়াদের শাসন আমলে তিনজন ১৬টি বাজেট উপস্থাপন করেছেন। জাতীয় পার্টির আমলে নয়টি বাজেট চারজন অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেন। তিনটি বাজেট দিয়েছে দুটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার। এই তিন মেয়াদের প্রথম অর্থাৎ ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। চলতি মেয়াদের শেষ বাজেট বা নতুন বাজেটে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে।

চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। গত ২০২১-২২ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। তার আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এভাবে প্রতি বছরই বেড়েছে বাংলাদেশের বাজেট।

বাংলাদেশ সময়: ১৯২৭ ঘণ্টা, জুন ১, ২০২৩
জিসিজি/আরএইচ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।