ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৮ শাবান ১৪৪৫

ভারত

বাংলাদেশিদের বিষয়ে দার্জিলিং-রায়গঞ্জের পথে হাঁটছে না কলকাতা

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৬৪৯ ঘণ্টা, নভেম্বর ২৮, ২০২৩
বাংলাদেশিদের বিষয়ে দার্জিলিং-রায়গঞ্জের পথে হাঁটছে না কলকাতা

কলকাতা: গত ১৯ নভেম্বর গুজরাটের আহমেদাবাদে ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কার্যত দাঁড়াতেই পারেনি রোহিত-কোহলির ভারতীয় টিম। ভারতকে ছয় উইকেটে পরাজিত করে ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ জেতে অস্ট্রেলিয়া।

ভারতের এই অপ্রত্যাশিত হারে স্বপ্নভঙ্গ হয় ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের। এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের কিছু ভিডিও ভাইরাল হতেই পশ্চিমবঙ্গের একদল মানুষের বিষাদ ও বিদ্বেষ যেন শেষ হয়েও হচ্ছে না শেষ!

সে কারণেই সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিংয়ের ‘রয়োপোরাস তক্তসং’ নামে একটি হোটেলের পর রাজ্যটির উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জের দুটি হোটেল বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ওই জেলার রায়গঞ্জ শহরের বিবেকানন্দ মার্কেটে ‘হোটেল নর্থ ইস্ট’ এবং ‘কণিষ্ক লজ’ নামে দুটি হোটেলের রিসেপশনে লেখা রয়েছে—‘নো রুমস এভেইলেবল ফর বাংলাদেশ সিটিজেনস’।

পশ্চিমবঙ্গের একাংশ যখন এভাবে তাদের বিষাদ ও বিদ্বেষ সামনে আনছে। তখন কলকাতার মারকুইস স্ট্রিটের হোটেল ব্যবসায়ীরা সেইসব বঙ্গবাসীর বিপক্ষেই হাঁটছেন। তাদের অভিমত, এসব প্রোপাগান্ডা করে একদল মানুষের লাভ হচ্ছে। না হলে খেলার সাথে হোটেল বা অন্য কিছু জড়াচ্ছে কেন? একহাতে তালি বাজে না। বাংলাদেশের দোষ বিচার করতে গেলে ভারতেও একাংশ দায়ী। অন্য রাজ্যে বিশ্বকাপ দেখতে আসা অনেক বাংলাদেশির সঙ্গে অসভ্য আচরণ করেছেন ভারতীয়রা। তখনই বোঝা যাচ্ছিল, এটা সহজে থামবে না। তাই হয়েছে। কোনো ভারতীয় যদি মনে করে, আগের বাংলাদেশ তাহলে তাদের বোঝায় ভুল রয়েছে।



কলকাতার মারকুইস স্ট্রিটের লিজেন্সি হোটেলের মালিক মনোতোষ সরকার বলেন, ‘বাঙালিদের আবেগ কী করে বুঝবেন যারা বাংলা ভাষাই বোঝে না। আমাদের শুধু নিয়ে গেলেই তো হবে না। দিতেও তো জানতে হবে। দিতে পারছি কই! শুধুই তো নিচ্ছি। আর কে কোথায় কারা কী করল তাই নিয়ে কলকাতা ভাবে না। কলকাতার নিজস্ব একটা সংস্কৃতি আছে। একটা ঐতিহ্য আছে। আমি বলব, এসব ছোট মনের পরিচয়। এসব ফালতু চিন্তা-ভাবনা। ব্যবসায়িক দিক দিয়ে আমাদের কাছে এসবের কোনো গুরুত্ব নেই। সাময়িক ব্যাপার। আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। ’

তিনি বলেন, ‘কলকাতার কোনো হোটেল এ ধরনের অশোভন আচরণকে প্রশ্রয় দেয় না। যার ফলে বাংলাদেশিদের জন্য কলকাতায় হোটেল বন্ধ হয়ে যাবে, তা কখনই হতে পারে না। তবে গোটা দার্জিলিং বা রায়গঞ্জে কি একটা বা দুটো হোটেলের ওপর পর্য়টকরা নির্ভরশীল নাকি? তারা রাখবে না, সে তাদের ব্যাপার। সবাই কী করছে, সেটাই আসল ব্যপার। আমরাও সবকিছু লক্ষ্য রাখছি। ভবিষ্যতে যদি দেখি, এটা বড় আকার ধারণ করছে তখন প্রকাশ্যে এর প্রতিবাদ জানাব। এখনই এসব নিয়ে আমরা ভাবছি না। বাংলাদেশিদের সব সময় ওয়েলকাম জানায় কলকাতা। কলকাতা কেন গোটা বাংলাই জানাবে। দু’একটা ঘটনা আমরা কানে নিই না। ’

অনেকেই মনে করে বাংলাদেশ না এলে মারকুইস স্ট্রিট অন্ধকার হয়ে যাবে—এ ব্যাপারে মনতোষ বলেন, এটা ঠিক কথা নয়। মারকুইস স্ট্রিট পর্যটকদের এলাকা, এটাকে ঘিরেই কলকাতার ট্যুরিস্ট স্পট। এখানে বিভিন্ন দেশ এবং নানা রাজ্যের মানুষ আসে। তবে বেশ কয়েকবছর ধরে বাংলাদেশিদের সংখ্যা বেশি। আর বাংলাদেশি কেন আসবে না? আমরা তো তাদের সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যবহার করিনি। আমাদের যেমন তাদের দরকার, ওনাদেরও আমাদের প্রয়োজন। একে অপরকে সহযোগিতা করার নামই তো সম্পর্ক। তাই নয় কি!

মারকুইস স্ট্রিটের এমারল্যান্ড হোটেলের ম্যানেজার প্রীতম দাস বলেন, বাঙালি বরাবর আবেগি। কিন্তু, এ বিষয়ে শুধু বাংলাদেশকে দোষ দিলে হবে না। ভারতের একাংশের বড় দোষ আছে। বিশ্বকাপ চলাকালীন আমরাও লক্ষ্য করেছি, বহু ভারতীয় বাংলাদেশিদের সঙ্গে বাজে আচরণ করেছেন। তাদের প্রতীক বাঘের পুতুল ছিঁড়ে তুলো বের করে দিয়েছে। এ ঘটনায় আমরাও কষ্ট পেয়েছি। ফলে এক হাতে তালি বাজে না। দুই দেশেরই একাংশ মানুষের দোষ আছে। তবে খেলা শেষ হয়ে গেছে। তারপরেও খেলাকে সামনে রেখে যারা ইস্যুকে জাগিয়ে রাখতে চাইছে, তাদের অন্য মতলব আছে। না হলে খেলার সঙ্গে হোটেলের কী সম্পর্ক! একজন হোটেল মালিকের কাছে টুরিস্ট তো তাদের ব্যবসা। ব্যবসায় লস করে প্রতিবাদ জানানো যায় নাকি? গৃহস্থ কি কখনও চোরের ওপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাবে? ফলে বোঝাই যাচ্ছে, প্রতিবাদের পেছনে অন্য কোনো মতলব থাকলেও থাকতে পারে। তবে তারা বাংলায় কোনোদিন সার্থক হবে না।



আরেক হোটেল মালিক আশরাফ বলেন, এসব প্রোপাগান্ডা ছাড়া আর কিছুই না। এসবের উদ্দেশ্য দুই পাড়ের বাঙালির মধ্যে বিদ্বেষ তৈরি করা। সেই আগুনে পা দিলে তাতে বাঙালিরাই জ্বলবে।

উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জে দুটি হোটেল বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ করার ঘটনা রোববার (২৬ নভেম্বর) সামনে আসে। এ ব্যাপারে রায়গঞ্জের একটি হোটেল মালিক অরিন্দম সিংহ রায় বলেন, বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া ভালো খেলেছে তাই তারা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। কিন্তু, সেখানে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের যে আচরণ, তা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও বেদনাদায়ক। আমাদের উভয় দেশের মধ্যে যে ভ্রাতৃত্বের পরিবেশ আছে, তা বাংলাদেশ নষ্ট করে দিচ্ছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই আমাদের এই সিদ্ধান্ত। জানি এই সিদ্ধান্তে হোটেল ব্যবসায় কিছু ক্ষতি হবে।

তিনি আরও বলেন, জানি বাংলাদেশের সব নাগরিকই এমনটা নয়। তবে সাময়িক প্রতিবাদ জানাচ্ছি বাংলাদেশিদের জন্য হোটেল বন্ধ রেখে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী প্রদীপ্ত কিশোর ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশি মানেই সবাই সমান নয়। সবাই এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। ফলে বাংলাদেশি বয়কট—এটা হতে পারে না।

রায়গঞ্জের বাসিন্দা প্রিয়রঞ্জন পাল বলেন, ভারতের হারে যেভাবে বাংলাদেশিদের একাংশ উল্লাস করেছে, সেই ভিডিও আমিও দেখেছি। এটা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। কিন্তু, তার জন্য বাংলাদেশিদের বয়কট করার যে চিন্তা-ভাবনা আমি সেটাকেও সমর্থন করি না। বাংলাদেশি মাত্রই বয়কট—এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য আহ্বান জানাব।

কলকাতার অধ্যাপক সন্দীপ চট্টোপাধ্যায় বলেন, প্রতিবেশী যদি অসৎ আচরণ করে অতটা গায়ে লাগে না, যতটা গায়ে লাগে ভাইয়ে ভাইয়ে। ভাই যদি আরেক ভাইকে কিছু বলে দেয়, অপর ভাই তখন শান্ত থাকে না। বাঙালি মানেই ভাই ভাই। ফলে ইউরোপ-আমেরিকা এরকম আচরণ কত করছে ভারতীয়দের সঙ্গে। কিন্তু প্রতিবাদ দেখবেন না। কিন্তু, গায়ে লাগে প্রতিবেশী বাঙালি যখন কিছু বলে। তাই এই বিষাদ ও বিদ্বেষ।

তিনি আরও বলেন, অনেকেই চায় না ভাইয়ে ভাইয়ে সুসম্পর্ক থাক। তাই এসব করে দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখতে চাইছে। আখেরে কাদের লাভ, এটা সকলেই বোঝে। পাকিস্তানি বাহিনীর হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সবচেয়ে বেশি কারা লাঞ্ছিত করেছিল, তৎকালী পূর্ব বাংলার বাঙালিদের একাংশ। তেমনি ভিন রাজ্যের অনেকেই হাতের পুতুল হয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গের একাংশ। আখেরে তাদের লাভ। তাই এসব নিয়ে আলোচনা যত কম হবে তত থেমে যাবে। আর যত হবে তত ওরা বুঝবে কাজ হচ্ছে, এভাবেই চলা উচিত। একজন ব্যবসায়ী সে খুব ভালো বোঝে নিজের ব্যবসাটা। বাংলাদেশিদের না নেওয়া মানে তো তার ব্যবসায় ক্ষতি। নিজের ক্ষতি করে সংসার চলে? তখনই চলে যখন তারা অন্য দিকে থেকে পুষিয়ে নেওয়া যায়।

কলকাতার লেখক সাদউদ্দিন বলেন, এরকম অসহিষ্ণু লোক দুই পাড়েই আছে। আমরা যেমন ভারতে খেলা দেখতে আসা বাংলাদেশিদের মাসকট (পুতুল) ছিঁড়ে দেওয়ার নিন্দা জানাই। ঠিক তেমনভাবেই তাদের ভারত হেরে যাওয়ায় উন্মাদনাকেও প্রশ্রয় দিতে পারি না। ফলে দুই পাড়ের দোষ আছে। আর এই দ্বন্দ্ব বাঁধাতে চাইছে দুই পাড়ের একাংশ। বাংলাদেশে একদল যেমন বলছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান কখনো জাতীয় সঙ্গীত হতে পারে না। ঠিক তেমনি ভারতের একাংশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশকেও এক লাইনে রাখছে। যারা বাংলা বোঝে না, তাদের বাঙালি সম্পর্কে কীভাবে আবেগ থাকবে। তাদের দোসর আছে কিছু বাঙালি। আর তাই খেলা আর মেলা এক করে দিচ্ছে। কিন্তু, এতে গোটা বাংলাদেশ বা ভারতের বিচার করলে তো হবে না। ফলে বাংলাদেশিদের জন্য হোটেল বন্ধ করে দেওয়া, এটা অসভ্য আচরণের পরিচয়। আমি নিন্দা জানাই। কলকাতা কখনও এদের প্রশ্রয় দেবে না।

বাংলাদেশ সময়: ১৬৩০ ঘণ্টা, নভেম্বর ২৮, ২০২৩
ভিএস/এমজেএফ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।