ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ৩১ মে ২০২৪, ২২ জিলকদ ১৪৪৫

তথ্যপ্রযুক্তি

মেট্রোনেট নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, ইন্টারনেট সেবায় বিঘ্ন ঘটার শঙ্কা

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট  | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৮৫৭ ঘণ্টা, মার্চ ৫, ২০২৩
মেট্রোনেট নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, ইন্টারনেট সেবায় বিঘ্ন ঘটার শঙ্কা

ঢাকা: দেশের বৃহত্তম ইন্টারনেটভিত্তিক তথ্য-প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘মেট্রোনেট’ নিয়ে প্রতিষ্ঠানেরই দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে।

রোববার (৫ মার্চ) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) সংবাদ সম্মেলনে এক পক্ষ বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবিরের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনেছেন।

আর আলমাস কবিরের পক্ষ থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বনানী অফিসে হামলার অভিযোগ করা হয়েছে।

ডিআরইউতে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মেট্রোনেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ দাবি করা মোস্তাফা রফিকুল ইসলামসহ কোম্পানির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস আজম খান, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল আলম, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট রাহাত খান প্রমুখ।

রফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের বৃহত্তম ইন্টারনেটভিত্তিক তথ্য-প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান মেট্রোনেট বাংলাদেশ লিমিটেড বন্ধের গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। মেট্রোনেটের সেবা বন্ধ হলে হুমকির মুখে পড়তে পারে সারা দেশের ইন্টারনেট সেবা। মেট্রোনেটের দুই শতাংশ মালিক ও বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবিরের বিরুদ্ধে নিয়মনীতি ভঙ্গ করে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে।  

এর ফলে দেশের জরুরি তথ্যসেবা ৯৯৯, সব ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্স সার্ভিস বিকাশ, নগদ, চট্টগ্রাম স্টক একচেঞ্জ, জাতীয় পরিচয়পত্র অনুসন্ধান সেবা, ই-পাসপোর্টসহ রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মোস্তাফা রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, মেট্রোনেটের শেয়ারের হোল্ডার প্রতিষ্ঠান রহিম আফরোজ ও সৈয়দ আলমাস কবির যোগসাজশে ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে মেট্রোনেট থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা এবং ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে প্রায় ৮ কোটি টাকা শেয়ার ক্রয়ের নামে সরিয়ে নিয়েছে। অবৈধভাবে কোম্পানির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে মোট প্রায় ১১ কোটি টাকা তুলে নেওয়াতে শিগগির তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ২০২২ সালের ৫ ডিসেম্বরের পর থেকে বর্তমান বোর্ড কোম্পানির দৈনন্দিন কার্যক্রম সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সৈয়দ আলমাস কবির ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ৮ ডিসেম্বর থেকে বিভিন্ন ব্যাংকে লেনদেন বন্ধের জন্য বেআইনিভাবে চিঠি প্রদান করে চলেছেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন ব্যাংকসহ গ্রাহকদের বিল পরিশোধ না করার জন্য চিঠি প্রদান করেন। কোম্পানি বিরোধী কার্যকলাপের কারণে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও পদধারী সৈয়দ আলমাস করিবকে প্রথমে সিইও পদ থেকে অ্যাডভাইজার পদে এবং পরবর্তীতে তার এই কোম্পানির বিপক্ষে অসাধু কার্যকলাপ এবং ধারাবাহিকভাবে তিনটির অধিক বোর্ড মিটিংয়ে অনুপস্থিত থাকার কারণে তাকে পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক উভয় পদ হতে অব্যহতি দেওয়া হয়।  

তিনি বলেন, রহিম আফরোজ গ্রুপ ২০১৯ সালে তাদের সম্পূর্ণ শেয়ার বিক্রি করে মেট্রোনেট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের সঙ্গে ফ্লোরা টেলিকম, ফেরদৌস আজম খানও শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শেয়ার বিক্রির জন্য কাঙ্ক্ষিত গ্রাহক না পাওয়ায় মেট্রোনেটে অপারেশনে থাকা কর্মকর্তাদের শেয়ার ক্রয়ের প্রস্তাব করে। কিন্তু আলমাস কবির একাই মালিক হওয়ার উদ্দেশ্যে বাকি তিন কর্মকর্তার সঙ্গে প্রতারণা করে রহিম আফরোজ গ্রুপ, ফ্লোরা টেলিকম এবং মেট্রোনেটের প্রতিষ্ঠাতা ফেরদৌস আজম খানের সম্পূর্ণ শেয়ার নিজ নামে ক্রয়ের উদ্দেশে ২০২২ সালের জুনে প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদাভাবে শেয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট (এসপিএ) সই করেন।  

কোম্পানির প্রায় ৯৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক হওয়ার কু-চক্রান্ত করেন। শেয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী টাকা পাওয়ার জন্য অনুরোধ করতে থাকি। যেখানে ২ মাসে অর্থ পরিশোধের চুক্তি ছিল সেখানে প্রায় ৬ মাস অতিবাহিত হয়ে যায়, একপর্যায়ে সৈয়দ আলমাস আমাদের ফোন এবং ইমেইল যোগাযোগের উত্তর দেওয়া বন্ধ করে দেন। অনেক গড়িমসির পর ৫ ডিসেম্বর একটি বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ফ্লোরা টেলিকম লিমিটেডের মনোনীত পরিচালক হিসেবে আমি মোস্তাফা রফিকুল ইসলাম ও ফারাহ ইসলাম এবং স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে ফেরদৌস আজম খান অনুমোদন পাই। সে অনুযায়ী, আমরা আরজেএসসিতে নথি জমা দিয়ে অনুমোদন নিয়ে মেট্রোনেট বাংলাদেশ লিমিটেডের নতুন বোর্ড গঠন করি।  

মোস্তাফা রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের বোর্ড যখন সুষ্ঠুভাবে দৈনন্দিন কর্ম পরিচালনা করছিল তার মাস খানেক পর রহিম আফরোজ গ্রুপও বোর্ডে প্রবেশ করার জন্য আদালতে গেলে ২৩০০ কোটি টাকার অধিক ঋণখেলাপি হিসেবে তাদের আবেদন নাকচ করে দেন, পরবর্তীতে তারা উচ্চতর আদালতে এসে প্রথমে বোর্ডের বিপক্ষে ইনজাংশন চেয়ে নেন। ইনজাংশন পাওয়ার পর বোর্ড সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপিলেড ডিভিশন থেকে আবেদন করে ওই ইনজাংশনের বিপক্ষে স্টাটার্স-কো অর্ডার অর্জন করে দৈনন্দিন কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ অবস্থায় রহিম আফরোজ গ্রুপ এবং আলমাস কবির অফিসে প্রবেশ করে আদালত অবমাননা করছেন।  

তিনি এখনও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও পদ ব্যবহার করে কোম্পানির এবং বোর্ডের বিপক্ষে ভাড়াটে ও বহিষ্কৃত কিছু কর্মকর্তাদের নিয়ে বেআইনি কার্যকলাপ চালাচ্ছেন। সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপিলেড ডিভিশনের স্টাটার্স-কো অর্ডারের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক এবং কাস্টমারদেরকে বিভ্রান্ত করছেন, গুলশান-২ রেজিস্টার্ড অফিসের ইন্টারনেট সংযোগ, ফোন ও পিএবিএক্স সংযোগ, ইমেইল, ইআরপি, বিভিন্ন সার্ভারসহ নেটওয়ার্ক এক্সেস সার্ভিস পাসওয়ার্ড চেঞ্জ করে দিয়েছে এবং আমাদের বিল কালেকশন টিমের ই-মেইল, ফোন এক্সটেনশন ক্লোন করে বনানী অফিসে নিজস্ব লোক দিয়ে বেআইনিভাবে মানি রশিদ প্রিন্ট করে বিল আদায় করছে। এসব বিষয়ে থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।  

এর আগে আইএল কর্প লিমিটেড নামক একটি কাগুজে কোম্পানি দিয়ে মেট্রোনেট বাংলাদেশ লিমিটেডকে গ্যারান্টি করে মেঘনা ব্যাংক থেকে শতকোটি টাকার ঋণ নেওয়ার প্রচেষ্টা করেন সৈয়দ আলমাস কবির।

অন্যদিকে সৈয়দ আলমাস কবিরের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে মেট্রোনেটের সার্ভিস বন্ধ করার জন্য এর বনানী ডাটা সেন্টার অফিসে সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগ করা হয়।

এতে বলা হয়, মেট্রোনেট বাংলাদেশ লিমিটেড ২০০১ সালে দেশের প্রথম মেট্রোপলিটন এরিয়া নেটওয়ার্ক স্থাপন করে এবং দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সেবা দিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠার ২০ বছরের বেশি সময়ে দেশ-বিদেশের চার হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানকে সেবা দিচ্ছে মেট্রোনেট বাংলাদেশ লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠান এর ৫১ শতাংশ মালিকানা দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান রহিম আফরোজ বাংলাদেশ লিমিটেডের এবং রহিম আফরোজ বাংলাদেশ লিমিটেডের নেতৃত্বে বিগত ২০০৪ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি ক্রমাগত সাফল্য অর্জন করে।

বুধবার (১ মার্চ) তারিখে একজন শেয়ারহোল্ডার ১০/১২ জন সন্ত্রাসীসহ মেট্রোনেট বাংলাদেশ লিমিটেডের সার্ভিস বন্ধ করার জন্য এর বনানীস্থ ডাটা সেন্টার অফিসে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং এর মাধ্যমে সরকারের ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি সার্ভিস (৯৯৯), ই-পাসপোর্ট, ব্যাংক, বিমা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডাটা সংযোগ সার্ভিস বন্ধ করে রহিমআফরোজ বাংলাদেশ লিমিটেডকে মেট্রোনেট বাংলাদেশ লিমিটেড পরিচালনায় অক্ষম দেখানোর অপচেষ্টা করে। পাশাপাশি মেট্রোনেট বাংলাদেশ লিমিটেডের ফেক ডোমেইন চালু করে এবং তা ক্রেতা ও সেবা গ্রহীতাদের সঙ্গে শেয়ার করে প্রতারণা ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করছে।

বিজ্ঞপ্তিততে আরও বলা হয়, তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেট্রোনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান। এমন অবস্থায় কয়েকজন শেয়ারহোল্ডার আদালতের আদেশ অমান্য করে ভাড়াটে সন্ত্রাসী নিয়ে মেট্রোনেটের অফিসে এ হামলা পরিচালনা করে এবং নিজেদের কু-কীর্তি আড়ালের জন্য মিথ্যা সংবাদ সম্মেলন করে।

বাংলাদেশ সময়: ১৮৫৫ ঘণ্টা, মার্চ ০৫, ২০২৩
এমআইএইচ/এএটি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।