ঢাকা, বুধবার, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৭ শাবান ১৪৪৫

অপার মহিমার রমজান

প্রতিদিন ছয় হাজার রোজাদারকে ইফতার করানো হয় যেখানে

শেখ তানজির আহমেদ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৮১১ ঘণ্টা, মার্চ ২৮, ২০২৩
প্রতিদিন ছয় হাজার রোজাদারকে ইফতার করানো হয় যেখানে

সাতক্ষীরা: ফজরের নামাজের পরপরই শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করেন সবাই।

এই ব্যস্ততা চলে ইফতারের পূর্ব পর্যন্ত। দীর্ঘ এই সময়ে ছয় সহস্রাধিক রোজাদারের জন্য তৈরি করা হয় ছোলা ভুনা, সিঙ্গারা ও ফিরনি। সিদ্ধ করা হয় ডিম। ভেজানো হয় চিড়া। সেই সঙ্গে দেওয়া হয় কলা ও খেজুর।  

এরপর তা প্লেটে সাজিয়ে পরিবেশন করা হয় রোজাদারদের। দিনভর এই কর্মযজ্ঞ চলে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের নলতা রওজা শরীফে। দিন গড়িয়ে ইফতারের সময় যতই ঘনিয়ে আসে, ততই ভরতে থাকে ইফতারের জন্য প্যান্ডেলকৃত মাঠ।  

পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের নলতা রওজা শরীফে আয়োজিত এই ইফতার মাহফিল দেশের সর্ববৃহৎ ইফতার মাহফিল বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। যা চলে রমজান মাসজুড়ে।  

নলতা রওজা শরীফ সূত্র জানায়, ১৯৩৫ সালে খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ (রা.) নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশন প্রতিষ্ঠা করার পর থেকে প্রতি বছরই রমজান মাসব্যাপী ইফতার মাহফিলের আয়োজন করতেন। তার মৃত্যুর পরও মিশন কর্তৃপক্ষ এই মাহফিল অব্যাহত রেখেছে।

বর্তমানে শাহ সুফি হযরত খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ (র.) এর রওজা প্রাঙ্গণেই দেশের সর্ববৃহৎ এই ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়। রমজান মাসের শুরু থেকে প্রতিদিন রওজা শরীফের মাঠে একত্রিত হয়ে ইফতার করেন ছয় সহস্রাধিক মানুষ। মাসজুড়ে চলমান এই ইফতার মাহফিলে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষও হাজির হন রওজা প্রাঙ্গণে।  

সরেজমিনে গেলে বিশাল এই কর্মযজ্ঞ চোখে পড়ে। কেউ সিঙ্গারা বানাচ্ছেন, কেউ ডিম সিদ্ধ করতে ব্যস্ত, কেউ বা ফিরনি রাধছেন। কেউ ভুনছেন ছোলা।  

এদেরই একজন আসাদুর রহমান। তিনি ২৫ বছর ধরে এই ইফতার মাহফিল আয়োজনের সঙ্গে জড়িত।  

আসাদুর রহমান বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকে নলতা রওজা শরীফের ইফতার মাহফিল দেখে আসছি। আমি নিজেই ২৫ বছর ইফতার তৈরির সঙ্গে জড়িত। একসঙ্গে অনেক মানুষের ইফতার তৈরির এই কাজটি আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে করে থাকি। এজন্য আমাদের ফজরের নামাজের পর থেকেই কাজ শুরু করতে হয়। চলে ইফতারির আগ পর্যন্ত।

ছোলা ও ফিরনির বাবুর্চি বাবু বলেন, প্রতিদিন ১৬ মণ দুধ দিয়ে ফিরনি রান্না করা হয়। সিদ্ধ করা হয় ৬ হাজারেরও বেশি ডিম। ৫ মণ ছোলা, ৫০ কেজি চিড়া এবং ফিরনির জন্য ৯৫ কেজি সুজি। এসব রান্নায় ব্যয় হয় গড়ে আড়াই লাখ টাকা। প্রতি বছরই আমি এখানে রান্নার কাজ করে থাকি। এ মাসটি আমরা রোজাদারদের খেদমত করি।

সিঙ্গারার বাবুর্চি মুক্তার হোসেন বলেন, আমি এখানে ৩২ বছর ধরে সিঙ্গারা বানাচ্ছি। ১৫ জন একত্রে কাজ করি। আসরের নামাজের আগেই সিঙ্গারা প্রস্তুত করা হয়।
 
স্বেচ্ছাসেবক আশিকুর রহমান বলেন, এখানে আড়াই শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক ইফতার বণ্টনে নিয়োজিত থাকে। প্রথমে সারিবদ্ধভাবে পানির পট ও গ্লাস দেওয়া হয়। এরপর প্লেট সাজিয়ে ইফতারের আগ মুহূর্তে পানির পাত্রের পাশে সারিবদ্ধ করে দেওয়া হয়। চেষ্টা করা হয়, কেউ যেন ইফতার করতে এসে কষ্ট না পান।  

নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ইফতার মাহফিলের দায়িত্বে থাকা এনামুল হক বলেন, ইফতার মাহফিল নলতা রওজা শরীফের একটি ঐতিহ্য। এখানে আগে প্রতিদিন ১০ হাজার মানুষের ইফতার তৈরি হতো। এর মধ্যে ছয় হাজার মানুষ একসঙ্গে বসে ইফতার করতেন। আর বাকি চার হাজার মানুষের ইফতার রওজা শরীফের আশপাশের ২০-২৫টি মসজিদে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু করোনায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর বাইরের মসজিদে ইফতার পাঠানো বন্ধ রয়েছে। এখন শুধু এখানে একসঙ্গে বসে ইফতারের জন্য ছয় সহস্রাধিক মানুষের ইফতার তৈরি করা হয়। আজ ইফতার তৈরি হয়েছে ছয় হাজার ২০০ মানুষের।  

মূলত হযরত খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ (র.) এর দেশ-বিদেশের অনুসারীদের অর্থায়নে এখানে ইফতার দেওয়া হয়। আমাদের জানা মতে, এটাই দেশের সবচেয়ে বড় ইফতার মাহফিলের আয়োজন। যা রমজান মাসজুড়ে চলে।  

বাংলাদেশ সময়: ১৮০০ ঘণ্টা, মার্চ ২৮, ২০২৩
আরএ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।