ঢাকা, শনিবার, ৩০ চৈত্র ১৪৩০, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৩ শাওয়াল ১৪৪৫

অপার মহিমার রমজান

১৭ বছর ধরে এক টাকায় ইফতার

মাহবুবুর রহমান মুন্না, ব্যুরো এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৬৪৫ ঘণ্টা, এপ্রিল ১১, ২০২৩
১৭ বছর ধরে এক টাকায় ইফতার

খুলনা: চারদিকে তীব্র গরম আর রোদে হাঁসফাঁস অবস্থা। খুলনায় যেন লু হাওয়া বইছে।

কোথাও যেন স্বস্তি নেই। অসস্তিকর এ পরিস্থিতির মধ্যেও একটি স্বস্তির বিষয় হলো খুলনায় এক টাকায় ইফতার কিনতে পাওয়া যায়। দ্রব্যমূল্যের এ চরম ঊর্ধ্বগতিতে প্রথম রোজা থেকেই এ কার্যক্রম চালাচ্ছেন খুলনার দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশার ইকবাল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের মালিক ইকবাল হোসেন মোল্লা।

অসহায়রা যেন এ ইফতারিকে করুণা বা দান মনে না করেন এজন্য ইফতারি আইটেমের মূল্য নিচ্ছেন ‘এক টাকা’। পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও কাঁচা ঝালের চপ, আলুর চপ, পেঁয়াজু, বেগুনি প্রতি পিস মাত্র এক টাকা মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে তার দোকানে। প্রতিদিন সেই ইফতারি কিনতে ভিড় করছেন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও পথের মানুষ। বাদ পড়ছেন না খেটে খাওয়া মানুষ।

এবার পণ্যমূল্য বাড়ায় ইকবাল মোল্লা অনেকটা পিছুটান দিয়েছিলেন। কিন্তু তার ঘনিষ্ট কয়েকজন বন্ধু এগিয়ে এলেন এ মহতী কাজের সহযোগী হয়ে। সবাই অংশগ্রহণমূলকভাবে এবারও এক টাকার ইফতারি বিক্রি করে ধারাবাহিকতা বজায় রাখলেন। তার এ কাজে মুসলমানদের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছেন সেখানের অন্য ধর্মের কয়েকজন বন্ধুও। ইকবাল মোল্লার সঙ্গে যেমন রয়েছেন আব্দুল খালেক, মনিরুল ইসলাম টুটুল, হাফিজুর রহমান, হায়দার আলী, রায়হান তেমনি রয়েছেন শিবুপদ দে, রিঞ্জনসহ ভিন্ন ধর্মের মানুষও। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এমন দৃষ্টান্ত দেখে অনেকেই বলছেন সামাজিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে ধর্ম বা জাত নেই। সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমেই পাল্টে যেতে পারে সমাজ, বদলে যেতে পারে সমাজের চিত্র।

মঙ্গলবার (১১ এপ্রিল) বিকেলে ইকবাল হোসেন মোল্লা বাংলানিউজকে বলেন, এবার অর্থনৈতিক কারণে কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু বন্ধুরা এগিয়ে এসে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করে। প্রতিদিন আলুর চপ, পেঁয়াজু, বেগুনি ও কাঁচা ঝালের চপ প্রায় সাত হাজার পিস তৈরি হয়। দুপুর ২টার পর থেকে বিক্রি শুরু হয়। বিকেল ৫টার মধ্যে সব আইটেম শেষ হয়ে যায়।

তিনি জানান, ১৭ বছর ধরে তিনি একাই প্রতি রমজানে এক টাকার ইফতারি বিক্রি করে আসছেন। বাকি সময় তিনি চা বিক্রি করেন। এতে তার বেশ কিছু টাকা ভর্তুকি দিতে হয়। কিন্তু তারপরেও সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত তথা শ্রমজীবী মানুষের ইফতারি কিনতে যাতে হিমশিম খেতে না হয় সেজন্যই তিনি এ উদ্যোগ নেন।

স্থানীয় বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক মাসুম বিল্লাহ বলেন, এখান থেকে আমি ইফতারি কিনেছি ৪ থেকে ৫ দিন। ইফতারির মান ভালো। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে পরিবেশন করেন দোকানিরা।

ফুড ব্লগিং পেজ ফুড স্টুডিও-এর গোপাল কর্মকার বলেন, তিন বছর আগে আমি আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে ইকবাল ভাইয়ের কথা জানতে পারি। জানা মাত্রই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও আমার পেজে একটি ভিডিও আপলোড করি। আমি নিজেই অবাক হয়েছি তারা ৮ থেকে ৯ জন বন্ধু মিলে প্রতি বছর এ আয়োজনটা করেন। ১৭ বছর আগে তারা শখের বসে এ ইফতারি বিক্রির দোকান চালু করেন। তাদের বন্ধুদের ভেতর একজন আছেন যার নাম শিবু উনি শুধুমাত্র ইফতারি বিক্রির কথা মাথায় রেখে এক মাস ট্রাক চালানো বন্ধ করে দেন। ইফতারি বিক্রিতে সাহায্য করেন এবং তাদের বন্ধুদের মূল উদ্দেশ্যই কম মূল্যে মানুষকে ইফতার করানো। আমি আরও জানতে পারি ঈদের আগের দিন মানে চাঁদ রাতের দিনের যে রোজাটা হয় ওই রোজাতে তাদের কোনো ইফতারি আর বিক্রি করা হয় না। পুরো ইফতারি তারা মানুষকে বিনামূল্যে দিয়ে দেন। এ ধরনের মানুষ সমাজে খুবই প্রয়োজন। যারা রমজান মাসকে কেন্দ্র করে প্রত্যেকটা জিনিসের দাম বাড়িয়ে দেয় তাদের অনুকরণীয় হতে পারে এ মানবিক মানুষগুলো।

বাংলাদেশ সময়: ১৬৪২ ঘণ্টা, এপ্রিল ১১, ২০২৩
এমআরএম/আরবি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
welcome-ad