আগরতলা (ত্রিপুরা) থেকে ফিরে: ব্রিটিশ রেলের সিল-সাপ্পল মুছে দেশি অবয়ব নিয়েছে আগরতলা স্টেশন। স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিল রেখে পুরো স্টেশন ভবনটি গড়া হয়েছে উজ্জয়ন্ত প্রাসাদের আদলে।
নতুন পরিকল্পনায় গোমতির উদয়পুর আর দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুম সীমান্ত পর্যন্ত (বাংলাদেশের রামগড়)নতুন যে রেল রাস্তা হচ্ছে, সেগুলোর প্রধান স্টেশনও হবে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী কোনো স্থাপনার আদলেই। যেমন উদয় পুরের স্টেশন ভবনটি হবে মাতাবাড়ির ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরের মতো।
আগরতলা স্টেশন ভবনটি ছিমছাম, পরিপাটি। চকচকে প্লাটফর্ম। ট্রেনের জন্য অপেক্ষারত যাত্রী উপস্থিতি যথেষ্ট হলেও কোলাহল একদমই নেই। উৎপাত নেই হকারের। স্থানে স্থানে দেওয়ালে আঁকা নানা চিত্রকর্ম। দুই সারি লাইনের মাঝ দিয়ে ট্রেনে সরবরাহের জন্য পানির পাইপ।
উত্তরে এই রেললাইন আসাম পেরিয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি পর্যন্ত। পূবে অরুণাচল পর্যন্ত যাওয়া যায় এখান থেকে।
উদয়পুর আর সাব্রুম ছাড়াও বাংলাদেশের আখাউড়ার সঙ্গে সংযোগ হচ্ছে আগরতলা স্টেশনের। বাধারঘাটের এই স্টেশন থেকে বের হয়ে রেলরাস্তাটি বাংলাদেশে প্রবেশ করবে নিশ্চিন্তপুর সীমান্ত দিয়ে। এজন্য নতুন করে ১৫ কিলোমিটার সংযোগ লাইন বসছে ৯৬৮ কোটি রূপীতে। ভারতীয় অংশে এর দৈর্ঘ ৫.০৫ কিলোমিটার। সঙ্গে ৩.৭০ কিলোমিটার থাকছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বাকিটা বাংলাদেশ অংশে। পুরো প্রকল্পের ব্যয় ভারতই বহন করবে।
গত ৩১ জুলাই যৌথভাবে এ প্রজেক্ট উদ্বোধন করেছেন বাংলাদেশের রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক ও ভারতের রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভাকর প্রভু। স্টেশনের সামনে তাদের নামাঙ্কিত শিলাস্তম্ভ জ্বলজ্বল করছে। ২০১৯ সাল নাগাদ প্রকল্পটি চূড়ান্ত রূপ পেলে বাংলাদেশের সঙ্গে যেমন যাত্রী পরিবহন আর আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সহজ হবে, তেমনি কলকাতার সঙ্গে দূরত্ব কমে যাবে ত্রিপুরার।
আগরতলা থেকে এখন গুয়াহাটি হয়ে কলকাতা যেতে পাড়ি দিতে হয় ১ হাজার ৬৫০ কিলোমিটার পথ। সময় লাগে প্রায় ৩ দিন। কিন্তু আখাউড়া হয়ে কলকাতা গেলে হাজার কিলোমিটার পথ কমে যাবে এক টানে। মাত্র সাড়ে ৬শ’ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে ক’ঘণ্টাইবা আর লাগবে?
বাধাঘাটের স্টেশন থেকে বেরিয়েই সোজা ত্রিপুরা ইউনিভার্সিতে। পূজার ছুটি বলে সকাল সাড়ে দশটাতেই খা খা করছে ক্যাম্পাস। মহারাজা বীর বিক্রমের নামে ১৯৮৪ সালে এই ইউনিভার্সিটি গড়ে কেন্দ্রীয় সরকার। পরিকল্পিত ক্যাম্পাস সুন্দর করে সাজানো। তবে এর চেয়েও সুন্দর ক্যাম্পাস মহারাজা বীর বিক্রম (এমবিবি) কলেজের। টিলাময় ক্যাম্পাসটি বড় বড় গাছের সবুজে আর ছায়ায় ছাওয়া। এখানে এলেই শরীর জুড়িয়ে যাবে নিমিষে। রাজ্য সরকারের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে এটিও।
আগরতলার উত্তরে দোলেশ্বরে দেখা গেলো, শত বছরের এক প্রাচীন মসজিদের পাশে গোরক্ষনাথের মন্দির। মসজিদ-মন্দিরের এমন সহাবস্থান বিরলই বটে। মসজিদটির নাম চন্দ্রপুর মসজিদ। মাগরিবের নামাজের আয়োজন চলছে সেখানে। ওপাশে গোরক্ষনাথের মন্দিরের দরোজা বন্ধ। বিশাল কাঠের দরোজায় খোদাই করা কারুকাজ। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ এক অনন্য নজির যেনো।
ইতিহাস বলছে, ত্রিপুরায় মন্দির নির্মাণের পাশাপাশি বৌদ্ধ মঠ আর মসজিদ নির্মাণেও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন মাণিক্য রাজারা।
বাস স্ট্যান্ডের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া আগরতলার একমাত্র নদী হাওড়ায় ঘোলা জলের স্রোত। স্থানীয় ভাষা ককবরকে এ নদীর নাম সাঈদ্রা। ক’দিন পরই দেবী বিসর্জনের মিছিলের পর মিছিল আসবে এই হাওড়ায়। ত্রিপুরার পাহাড়ি এলাকায় জন্ম নেওয়া হাওড়া নদী রাজধানী আগরতলা চিরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া দিয়ে। তারপর এটি কিছুদূর এগিয়ে পতিত হয়েছে তিতাস নদীতে। ৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ আন্ত:সীমান্ত নদীর ৫০ কিলোমিটারই ত্রিপুরায়। বাংলাদেশ অংশে রয়েছে কেবল ১৫ কিলোমিটার প্রবাহ। তারপর থেকেই শুরু তিতাস নদী। মেঘনা পর্যন্ত যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৮ কিলোমিটার।
এখন বর্ষাকাল বলে পানি আছে হাওড়ায়। ভরা মৌসুম জুন-জুলাইয়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ মিটার গভীরতা পায় সর্বোচ্চ ৪০ মিটার প্রস্থের এ নদী। সেকেন্ডে তখন সর্বোচ্চ ৯৮ ঘণমিটার পানি বয়ে যায় হাওড়ার বুক বেয়ে। কিন্তু এখন প্রতিদিন্ই কমছে পানি প্রবাহ। আসছে শীত মৌসুমে শুকিয়েই যাবে হাওড়ার বুক। তারপর প্রাণ ফিরে পেতে পেতে ফের সেই বর্ষার মৌসুম। ৭০ বর্গকিলোমিটার নদী অববাহিকাও প্রাণ ফিরে পাবে তখন।
আরও পড়ুন:
**রাজ প্রাসাদ যেখানে জাদুঘর
**মাণিক্য রাজ্যের নাম কি করে ত্রিপুরা
**আড়াইশ’ টাকায় আগরতলা, ঢাকা থেকে ৪ ঘণ্টা
বাংলাদেশ সময়: ১৫২০ ঘণ্টা, অক্টোবর ০৩, ২০১৬
জেডএম/