নাফাকুম (রেমাক্রী, বান্দরবান) থেকে ফিরে: গহিন অরণ্যের ভেতর দুর্গম পথ। কখনো ছোট ঝিরির প্রবাহের কারণে শ্যাওলা জমে পাথরের খাঁজ কাটা পথ এতটা পিচ্ছিল, একটু ভুল হলেই চিৎপটাং।
চিরযৌবনা জলপ্রপাত (ঝরনা) বান্দরবানের থানচি উপজেলার রেমাক্রীর নাফাকুম জয়ী পর্যটকেরা পথহীন এ পথেই হাঁটছেন।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটায় একজন গাইডসহ বাংলানিউজের পাঁচ সদস্যের একটি দল থানচি ঘাট থেকে নাফাকুম অভিমুখে যাত্রা শুরু করে।
সরেজমিন নাফাকুম পরিদর্শন শেষে দলটি বিকেল তিনটার মধ্যে থানচি সদর ঘাটে পৌঁছায়।
রেমাক্রী বাজার থেকে নাফাকুম অভিযানে গাইড ছিলেন সুমন মারমা। তার নেতৃত্বে এবং থানচি-রেমাক্রী পথের গাইড প্রকাশ মল্লিকের সহযোগিতায় বড় বড় পাথরে পানির স্রোত বাধা পেয়ে সৃষ্ট বড় বড় ঢেউ ভেঙে নৌকা এগিয়ে চলল। একপর্যায়ে দুই গাইডের হাতে বড় পলিথিনের প্যাকেটে তুলে দেওয়া হলো মোবাইল ফোন, মানি ব্যাগসহ জিনিসপত্র। মাঝপথে খালের বাঁকে দুইবার নৌকা থেকে নেমে ৪০০ গজের মতো হাঁটতে হলো পর্যটকদের। সর্বশেষ একটি জায়গায় পুরোপুরি থেমে গেল নৌকা। গাইড ধারাল দা হাতে আগে আগে চললেন। পেছনে বাকিরা। ইতিমধ্যে পর্যটকদের ব্যবহৃত কয়েকটি বাঁশের কঞ্চি, গাছে সোজা ডাল কেটে তৈরি লাঠি পাওয়া গেল। যেগুলোর ওপর ভর দিয়ে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটা যায়। গা ছমছম করা পথ। উঁচু-নিচু পথ। ওই পথে পড়ে আছে চালতা গাছ, ডুমুরসহ নানান ফল।
পাঁচ মিনিট হাঁটার পর গাইড থামলেন খালের কিনারায়। বললেন সাঁতরে পার হতে হবে ওপারে। স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটতে হবে, নইলে মুহূর্তেই অনেক দূরে চলে যাবেন। এক্ষেত্রে বড় সমস্যা হবে ছিটকে পড়া পর্যটক ধারাল, পিচ্ছিল পাথরের সঙ্গে বাড়ি খেতে খেতে গুরুতর আহত হবেন।
একে তো সাহসী পর্যটকদের ঠিকানা নাকাফুম, দ্বিতীয়ত পুরোপুরি মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক কিংবা ইন্টারনেটের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন অঞ্চল হওয়ায় দলছুট হওয়া মানেই বিপদ। আর গাইডের কথা না শুনলে তো মহাবিপদ!
সুমন মারমা বলেন, রেমাক্রী বাজার থেকে নাফাকুম শীতকালে পুরোটাই হেঁটে যেতে হয়। এখন উজানে বৃষ্টি হওয়ায় নাফাকুম খালে অর্ধেক পথ ইঞ্জিন চালিত নৌকায় পাড়ি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে বাকি অর্ধেক পথ বৃষ্টি ও ছোট ছোট অসংখ্য ঝিরি-ঝরনার কারণে সাধারণ পর্যটকদের কাছে কষ্টসাধ্য মনে হয়।
তিনি বলেন, নাফাকুম নিয়ে অনেকে অহেতুক ভয় করেন। আবার অনেক মানুষ আছেন রহস্যজনক কারণে ভয় দেখান। বাস্তবতা হচ্ছে ঝুঁকিমুক্ত বলা না গেলেও লাইফ জ্যাকেট, দ্রুতগতির নৌযান, রেমাক্রী বাজারের হোটেল, কটেজ এমনকি গাইডের বাড়িতে ব্যাগ, অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রেখে যাওয়ার সুযোগ থাকায় শুধু কেডস বা শক্ত স্যান্ডেল, শর্টস, ক্যাপ বা গামছা নিয়েই নাফাকুমের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করা যাবে।
তিনি বলেন, নাফাকুম ঝরনার আশপাশে পাথরের ওপর বড় বড় ডিম্বাকৃতির কিছু কুম (গর্ত) আছে যেগুলোতে পা দিতে নিষেধ করি আমরা। কারণ দেখতে কম পানি মনে হলেও গর্তগুলো কয়েক হাত গভীর। আরেকটি বিষয়, নাফাকুম ঝরনায় গোসল করতে নামলেই বিপদ। তাই সেটিও বারণ করি। যদি কেউ স্রোতে ভেসে যান তবে উদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা নেই। আশপাশে হাসপাতাল নেই।
স্রোতের ওপর নির্ভর করে খালে সাঁতারের সময় দুই পাড়ে একটি রশি বাঁধার পরামর্শ দেন তিনি।
প্রকাশ মল্লিক বলেন, নাফাকুম নিয়ে অনেকের মধ্যে অজানা ভীতি, আতঙ্ক কাজ করে। থানচিতে দীর্ঘদিন বসবাস করছেন, চাকরি করছেন এমন অনেক মানুষ নাফাকুম যাওয়ার সাহস করেনি। অথচ ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকেরা নাফাকুম নিয়মিত আসছেন।
পর্যটক যদি সকালে এসে নাফাকুম দেখে রেমাক্রী বাজারে রাতযাপন না করে বিকেলের মধ্যে থানচি সদর ফিরতে চান সেটিও সম্ভব করে দেখাল বাংলানিউজ।
** আড়াই লাখ বাতিতে উজ্বল বনবিহার
** ৮৪ হাজারের বেশি বাতি জ্বলবে যে বনবিহারে
** কোমর তাঁতে মুগ্ধ পর্যটক
বাংলাদেশ সময়: ০৯০৪ ঘণ্টা, অক্টোবর ২১, ২০১৬
এআর/এমআইএইচ/