ঢাকা, রবিবার, ২২ মাঘ ১৪২৯, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৩ রজব ১৪৪৪

অর্থনীতি-ব্যবসা

ফেলনা নারিকেলের ছোবড়ায় 'কোকো ফাইবার'

মো. নিজাম উদ্দিন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৭১৬ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১০, ২০২২
ফেলনা নারিকেলের ছোবড়ায় 'কোকো ফাইবার' ফেলনা নারিকেলের ছোবড়ায় 'কোকো ফাইবার'। ছবি: বাংলানিউজ

লক্ষ্মীপুর: গত কয়েক বছর আগেও নারিকেল ছোবড়া তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে আসত না। অনেকে এগুলো ফেলে দিত।

আবার কেউ কেউ শুধুমাত্র জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করত।  

কিন্তু এক সময়ের ফেলনা নারিকেলের ছোবড়া এখন অনেক দামি। শুধুমাত্র প্রক্রিয়াজাত করে বছরে অর্ধ কোটি টাকার বাণিজ্য হয় ফেলে দেওয়া এ নারিকেলের ছোবড়া থেকে। এমনটা জানিয়েছেন লক্ষ্মীপুরের ছোবড়া ব্যবসায়ীরা।

তারা জানান, নারিকেলের ছোবড়া থেকে তৈরি হয় 'কোকো ফাইবার'। যা দিয়ে সোফার সিট ও জাজিম তৈরি করা হয়।  

লক্ষ্মীপুরে কোকো ফাইবার প্রক্রিয়াজাত করার প্রধান কেন্দ্র সদর উপজেলার দালাল বাজারে। এখানে জেলার মধ্যে নারিকেলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি নারিকেলের উচ্ছিষ্ট ছোবড়া ঘিরে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি ছোবড়া প্রক্রিয়াজাত করণ কারখানা।

এছাড়া জেলার রায়পুর উপজেলার হায়দরগঞ্জ, মান্দারী, চন্দ্রগঞ্জ, রামগঞ্জ উপজেলার পানপাড়া, মীরগঞ্জ, সোনাপুর, কমলনগর উপজেলা হাজিরহাট, রামগতির আলেকজান্ডার ও জমিদারহাটেও ছোবড়া প্রক্রিয়াজাত করণ কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব এলাকায় ছোট বড় প্রায় ৩০টির মতো কারখানা রয়েছে। প্রতিটি কারখানায় নারী-পুরুষ মিলে কমপক্ষে ১০-১২ জন করে শ্রমিক কাজ করে।  

কারখানা শ্রমিক সেলিম জানান, গত ১০ বছর ধরে নারিকেলের ছোবড়ার আঁশ দিয়ে জাজিম, পাপোস, দঁড়ি, সোফা ও চেয়ারের গদিসহ বিভিন্ন ধরনের সৌখিন ও প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি করা হতো। বেডিং শিল্পেও ছোবড়ার ব্যবহার ছিল। আর ছোবড়া থেকে ফাইবার তৈরির সময় যে গুড়া পাওয়া যেতো তা কোনো কাজে লাগতো না। কিন্তু এখন কোকো ফাইবার নামে ছোবড়ার আঁশ এবং কোকোডাস্ট নামে ছোবড়ার গুঁড়ার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।  

রায়পুর উপজেলার হায়দরগঞ্জ বাজারের নারিকেল ব্যবসায়ী আবদুর রহিম জানান, প্রতিটি কারখানায় প্রতিদিন কয়েক টন ছোবড়াকে আঁশে পরিণত করা হয়। ব্যাপক চাহিদা থাকায় জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রতি বছর ছোবড়া প্রক্রিয়াজাত করণ কারখানা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ছোবড়া থেকে মেশিনের সাহায্যে বের করা হয় আঁশ বা ফাইবার। এক হাজার নারিকেলের ছোবড়ায় কমপক্ষে ৮০ কেজি আঁশ পাওয়া যায়।

একই এলাকার তোফায়েল জানান, গত দুই বছর আগেও প্রতিটি নারিকেলের ছোবড়া কেনা হতো ৫০ পয়সা দরে। এখন মান ভেদে প্রতিটি নারিকেলের ছোবড়া পাঁচ-সাত টাকায় কেনা হয়। ছোবড়া থেকে ফাইবার তৈরির পর প্রতি ২০ কেজি ওজনের একেকটি ফাইবার বান্ডেল বিক্রি করা হয় ৫০০-৬০০ টাকা দরে। প্রতিটি কারখানায় সপ্তাহে চার-ছয় ট্রাক ফাইবার উৎপাদন হয়। প্রতি ট্রাকে কমপক্ষে ২০০ বান্ডেল ফাইবার বহন করা হয়।  

তিনি জানান, সব খরচ বাদে একেকটি কারখানায় মাসে অন্তত ৫০ হাজার টাকা আয় হয়।

দালাল বাজারের সততা ট্রেডার্সের মালিক মো. জাকির হোসেন বলেন, আমরা ছোবড়া থেকে ফাইবার তৈরি করি। আমাদের থেকে ফাইবার নিয়ে বিভিন্ন কোম্পানি তোশকের ভেতরের অংশ, ম্যাট্রেস বা কয়ার ফেল্ট তৈরি করে। সে কারণে বর্তমানে ছোবড়ার আঁশ বা ফাইবারের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।  

লক্ষ্মীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, জেলায় দুই হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে নারিকেল বাগান রয়েছে। এছাড়া প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনাতেই রয়েছে নারিকেল গাছ। বাগান ও বাড়ি থেকে বছরে প্রায় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় কোটি শুকনো নারিকেল আহরণ করা হয়।  

জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর বিসিক শিল্প নগরীর সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শাহরিয়ার ইসলাম খান বলেন, নারিকেলের ফেলনা ছোবড়া প্রক্রিয়া করতে লক্ষ্মীপুরে অনেকগুলো কারখানা গড়ে উঠেছে। এতে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। অপ্রচলিত এ পণ্যের ব্যাপক বাজার তৈরি হওয়ায় এ জেলার অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে।  

বাংলাদেশ সময়: ০৭১৬ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১০, ২০২২
এসআই

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa