কখনো বা সেখানে খুঁজে পাই আমারই পূর্বপুরুষের মুখ, আত্মপরিচয়ের নিশানা।
মুর্শিদাবাদ সেই শহর, যেখানে সময় এসে থমকে দাঁড়িয়েছে অব্যক্ত বেদনায়, অস্ফূট স্বরে।
আর ইতিহাসরূপে যে অতীতের রুপান্তর ঘটে, তা আসলে অতীত নয়, ভবিষ্যত। তাই ইতিহাস বারবার সামনে এসে দাঁড়ায়। কারণ, ইতিহাসের জন্ম অতীতের গর্ভে, কিন্তু তার বিচরণ ভবিষ্যতে।
ইতিহাস তাই ফিরে আসে শত-হাজার বছর পরে, জন্ম-জন্মান্তরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের রক্তপ্রবাহ বেয়ে।
মুর্শিদাবাদ সব সময়কার গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। প্রাচীন ও মধ্যযুগে একাধিকবার রাজধানীও ছিল। এমনকি সপ্তম শতাব্দীতে রাজা শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণ-সুবর্ণ নাকি ছিল মুর্শিদাবাদেই। আর মুসলিম শাসনের সময়তো দীর্ঘকাল ছিল সুবে বাংলার রাজধানী। মুঘল আমলে বর্তমান বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার শেষে মুর্শিদাবাদের যাত্রা শুরু।
ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদের যেখানে রাজধানী নিয়ে যাওয়া হয়, সেটি ছিল একটি গ্রাম, নাম মুখসুদাবাদ।
ভাগীরথী নদীর পাশ দিয়েই বিস্তৃত পুরো মুর্শিদাবাদ। ঢাকা যেমন ছিল বুড়িগঙ্গার পাশে, কলকাতা যেমন হুগলির তীরে। এটি মূলত গঙ্গারই একটি স্রোতধারা, যা হুগলি ও ভাগীরথী নামে প্রবাহিত হয়েছে। ফারাক্কা থেকে প্রবাহিত গঙ্গাই হুগলি ও ভাগীরথী নামে মুর্শিদাবাদ হয়ে কলকাতায় পৌঁছেছে। মুর্শিদাবাদ থেকে ফারাক্কা ব্যারেজের দূরত্ব ১০৮ কিমি।
ভাগীরথীর দুই তীরে মুর্শিদাবাদের দুই রূপ। এর পশ্চিম তীরে প্রায় পুরোটাই গ্রাম। আর পূর্ব পাশে গড়ে উঠেছে শহর। সুবে বাংলার রাজধানী বা আজকের মুর্শিদাবাদ শহর মূলত ভাগীরথী নদীর পূর্বপাশ জুড়েই বিস্তৃত।
বাংলা তথা বাঙালির ইতিহাসে এই ভাগীরথী নদী ওতপ্রোতভাবেই জড়িয়ে আছে। আর ভাগীরথী যেখান থেকে এসেছে অর্থাৎ সেই গঙ্গা সেতো আজও ভাটি বাংলার জন্য এক জীবননদী। মুর্শিদাবাদের সঙ্গে বাংলা, বিহার ওড়িষ্যা অথবা আজকের বাংলাদেশের রয়েছে রক্ত ও আত্মার সম্পর্ক।
১৭০৪ সালে মুর্শিদ কুলি খাঁ সুবে বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে ভাগীরথীর পূর্ব তীরে মুখসুদাবাদ গ্রামে নিয়ে আসেন। মুর্শিদ কুলি খাঁ তার নিজের নাম অনুসারেই এর নাম দেন মুর্শিদাবাদ।
সুবে বাংলার শাসনামলে মুর্শিদাবাদ থেকেই শাসিত হতো বাংলা, বিহার ও ওড়িষ্যা। মুর্শিদ কুলি খাঁর আমল থেকেই এটি ছিল তার ও বাংলার পরবর্তী নবাবদের রাজধানী। রাজধানী আনার পর ১৭১৬ সালে মুর্শিদ কুলি খাঁ নিজামতের কেন্দ্রও এখানে নিয়ে আসেন। ফলে এর গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়।
মুর্শিদাবাদ ইতিহাসের অনেক মহাসত্যপোলব্ধির এক নীরব তীর্থভূমি।
কারণ, সবেমাত্র এটি গড়ে উঠতে শুরু করেছিল। এরই মাঝে এক হঠাৎ ঝড়ে সবকিছু ভেঙে চুরমার। মুর্শিদাবাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে শুধু এখানকার মানুষ ও জনপদের অগ্রগতিই থেমে যায়নি। পুরো একটি জাতি তথা পুরো ভারতবর্ষের ভাগ্যাকাশেও নেমে এসেছিল পরাধীনতার এক দীর্ঘ কালো মেঘ।
বাংলা তথা ভারতবর্ষের আকাশ থেকে স্বাধীনতার সূর্যটি ২০০ বছরের জন্য অস্ত গিয়েছে এই মুর্শিদাবাদ থেকেই। মুর্শিদাবাদের ললাটেও লেপিত হয়েছে ‘পরাজয়ের গ্লানি’। এ পরাজয়ের গ্লানিকেও হার মানিয়েছে 'বিশ্বাসঘাতকতা'। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে আমাদের হৃদয়ে এক তরুণ-শহীদ নবাবের দেশপ্রেমই চিরজাগরুক।
এ ইতিহাস খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু ভারতবর্ষের ইতিহাসে এর চেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা আর নেই!
মাত্র সত্তর বছর সুবে বাংলার রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ।
১৭৫৭ সালের জুনের পরের ইতিহাস মূলত পরাধীন ভারতবর্ষের ইতিহাস। এরপরও নবাবী শাসন ছিল, কিন্তু তা শেকলবন্দি ঘোড়ার মতোই, এর চেয়ে বেশি কিছু নয়।
এরপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ও আরো পরে রাখ-ঢাক না রেখে বিলাতি শাসন। কোম্পানি শাসনামলে যদিও কিছু দিন মুর্শিদাবাদই রাজধানী ছিল, কিন্তু কয়েকদিন পরেই রাজধানী নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতায়। মুর্শিদাবাদ রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক গুরুত্ব হারায়।
অত:পর ২০০ বছর..। যতোই সময় গড়ায়, তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ততোই বৃদ্ধি পায়। তাই আজও ফিরে ফিরে আসে মুর্শিদাবাদ, ভাগীরথী, মোহন লাল, মীর মদন, গোলাম হোসেন, সিরাজ, আলীবর্দী এমনকি মীর জাফরও।
বাংলাদেশ সময়: ০৯২৯ ঘণ্টা, এপ্রিল ০৭, ২০১৭
এএসআর