ঢাকা, সোমবার, ২১ ফাল্গুন ১৪৩০, ০৪ মার্চ ২০২৪, ২২ শাবান ১৪৪৫

জাতীয়

তীব্র শীতেও বসে থাকার অবসর নেই শ্রমজীবীদের

সুব্রত চন্দ, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট  | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৯১৪ ঘণ্টা, জানুয়ারি ৫, ২০২৩
তীব্র শীতেও বসে থাকার অবসর নেই শ্রমজীবীদের কাজের অপেক্ষায় শ্রমিকরা বসে আছেন

ঢাকা: সকাল ৮টা, কুয়াশাচ্ছন্ন চারদিক, বইছে হিমেল হাওয়া। সেই হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাস্তায় ছুটে চলেছে বিভিন্ন যানবাহন।

এর পাশেই ফুটপাথে জবুথবু হয়ে বসে আছেন দিনমজুর আকবর গাজী (৫৫)।  

পরনে পাতলা কাপড়, ছেঁড়া ট্রাউজার ও স্যান্ডেল। শীত থেকে বাঁচতে মাথায় মাফলার ও গলায় গামছা রেখে দিলেও মিলছে না রেহাই। শীতে কাঁপছেন তিনি।

রাজধানীর মগবাজার মোড়ে ফুটপাতে বৃহস্পতিবার সকালে এভাবেই বসে থাকতে দেখা যায় আকবর গাজীসহ বেশ কয়েকজনকে। তাদের সামনে মাটি পরিবহনের টুকরি ও কোদাল। তীব্র শীতেও কাজের খোঁজে বের হয়েছেন তারা।

গত দুই দিন রাজধানীসহ সারা দেশে তীব্র শীত। সচ্ছলদের অনেকেই এ সময় প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। কিন্তু দিনমজুর, রিকশাচালকসহ খেটে খাওয়া মানুষদের সেই সুযোগ নেই। পেটের দায়ে তাদের কনকনে শীতের মধ্যেই বের হতে হচ্ছে কাজের খোঁজে।

জানা যায়, প্রতিদিন সকালে মগবাজার মোড়ে জড়ো হন কয়েকশ শ্রমজীবী। তাদের কেউ দিনমজুর (মাটিকাটা, নির্মাণ সামগ্রী, পরিবহন, ইট ভাঙা, বিভিন্ন মেশিন পরিবহন), কেউ রাজমিস্ত্রি (নির্মাণ কাজ), কেউবা কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন। প্রয়োজন অনুসারে দৈনিক ৬০০ থেকে এক হাজার টাকা চুক্তিতে সেখান থেকে তাদের ভাড়া করেন মালিকরা। কিন্তু প্রতিদিন কাজ জোটে না সবার ভাগ্যে। তখন খালি হাতেই ফিরতে হয় কাজে যেতে না পারাদের।

সকাল ৭টা থেকে কাজের খোঁজে বসে থাকা আকবর গাজী জানান, তার বাড়ি খুলনার পাইকগাছায়। থাকেন রাজধানীর তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়ি এলাকায়। বাড়িতে তার মা, দুই ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রী রয়েছেন। দুইদিন ধরে কনকনে শীত পড়লেও সংসার চালাতে ভোরবেলা কাজের খোঁজে বের হতে হয়েছে তাকে।

তিনি বলেন, এই শহরে বাঁচতে হলে একজন মানুষের দৈনিক অন্তত ২০০ টাকার প্রয়োজন পড়ে। তার ওপর বাড়িতে পরিবারের জন্য টাকা পাঠাতে হয়। শীত হোক বা গরম, একদিন বসে থাকার উপায় নেই। তার ওপর চাইলেও প্রতিদিন কাজ পাওয়া যায় না। যেদিন কাজ পাই না, সেদিন না খেয়ে অথবা ধার করে খাবার খরচ যোগাড় চলতে হয়।

প্রায় এক মাস আগে বাড়ি থেকে এসেছেন সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার দিনমজুর মো. ফারুক গাজী (৪০)। আবার বাড়িতে পরিবারের কাছে যাওয়ার সময় হয়ে এলেও অর্থের অভাবে যেতে পারছেন না তিনি। বাড়িতে তার দুই ছেলে এক মেয়ে ও স্ত্রী রয়েছেন।

ফারুক বলেন, টানা তিন দিন কোনো কাজ পাইনি। জমানো টাকা যা ছিল, তাও শেষ। প্রতি এক মাস পর পর ছেলে-মেয়েদের দেখতে বাড়ি যাই। কিন্তু এখন বাড়ি যাবো যে, সেই টাকাটাও পকেটে নেই। বরং উল্টো বাড়ি থেকে টাকা আনতে হচ্ছে। আর কয়দিন কাজ ছাড়া থাকতে হবে, কে জানে।

কাজে যেতে পারলে কেমন আয় হয় এবং তা দিয়ে সংসার চলে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাজে যেতে পারলে দৈনিক ৬০০-৭০০ টাকা মজুরি পাওয়া যায়। কোনো কোনদিন সেটাও পাওয়া যায় না। কিন্তু নিত্যপণ্যের দাম দিন দিন বাড়ছে। এখন এক কেজি চাল কিনতে গেলে ৭০-৭৫ টাকা লাগে। আগে মাসে ১০ হাজার টাকা আয় করলে ৫ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠাতে পারতাম। এখন দুই-তিন হাজার টাকা পাঠাতেও কষ্ট হয়ে যায়। তার উপর আছে ঋণের বোঝা।

দিনমজুর এই দলটির পাশেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় মিস্ত্রিদের একটি দলকে। সেই দলের একজন আব্দুর রহিম (৫০)। বাড়ি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায়। ঢাকায় থাকেন মগবাজারের গাবতলা বগুড়া গলিতে।

আব্দুর রহিম বলেন, পেট তো আর শীত বোঝে না। পেটে খিদা থাকলে ঘুমও আসে না। তাই যতই শীত পড়ুক কাজের জন্য বের না হয়ে উপায় নেই। তাও যদি প্রতিদিন কাজ পেতাম। একদিন কাজ পাই তো আরেকদিন পাই না। জিনিসপত্রের যে দাম, কোনোমতে ডাল, ভাত খেয়ে বেঁচে আছি। বাড়িতেও ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারি না।

তিন আক্ষেপ করে বলেন, দেশে এত বড় বড় ব্রিজ হয়, এত উন্নয়ন হয়, কিন্তু আমাদের তো উন্নয়ন হয় না। আমাদের দিকে কেউ দেখে না।

তেজগাঁও এলাকার সাতরাস্তা মোড়ে যাত্রীর অপেক্ষায় রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় ষাটোর্ধ্ব মো. তোফায়েলকে। পেটের দায়ে এই বৃদ্ধ বয়সেও শীতের মধ্যে রিকশা চালানোর মতো কঠোর পরিশ্রমের কাজ করতে হচ্ছে তাকে। তারপরও রিকশা জমার টাকা তুলতেও কষ্ট হয়ে যাচ্ছে তার। প্রতিদিন রিকশার জমা হিসেবে মহাজনকেই তার দিতে হয় ১২০ টাকা।

তিনি বলেন, সকাল ৭টায় রিকশা নিয়ে বের হয়েছি। এখন বাজে প্রায় ১১টা। কিন্তু আয় হয়েছে মাত্র ১৫০ টাকা। অথচ অন্যান্য সময় এতক্ষণ রিকশা চালালে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা আয় হতো।

আয় কম হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, শীতের কারণে মানুষ ঘর থেকে কম বের হচ্ছে। আর বের হচ্ছে তাদের বেশিরভাগই ঠান্ডার কারণে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছে।

একই স্থানে কথা হয় ফেরি করে চা ও বিস্কুট বিক্রি করা আনোয়ারের সঙ্গে (৪৩)। তার বাড়ি কুমিল্লার হোমনা থানায়। তিনি বলেন, শীতের কারণে মানুষজন ঘর থেকে কম বের হচ্ছে। বেচা-বিক্রিও কম। কিন্তু তাই বলে ঘরে বসে থাকলে চলবে না। বাড়িতে বাবা, মা, ছেলে মেয়েসহ পাঁচজন রয়েছে। ইনকাম না করলে তাদের খাওয়াবো কী? তাই এই শীতের মধ্যেই ভোর বেলা বের হয়েছি। রাত ১২টা পর্যন্ত ফেরি করে চা বিক্রি করব, যা আয় হবে তা দিয়েই সংসার চালাতে হবে।

এদিকে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যাওয়ায় যাওয়ায় রাজধানীসহ সারাদেশে তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। এ ছাড়া কুয়াশার কারণে সূর্যের আলো না আসায় দিনের তাপমাত্রা বাড়ছে না। এটি আরও দুই একদিন থাকতে পারে। এরপর তাপমাত্রার কিছুটা উন্নতি হলেও জানুয়ারির শেষের দিকে আবার শৈত্যপ্রবাহ আসতে পারে।

এ বিষয়ে আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের দেশে জানুয়ারি মাসেই শীতটা বেশি পড়ে। সেই হিসেবে শীতের মাত্র শুরু। আগামী দুই এক দিনে দিনের তাপমাত্রা কিছুটা উন্নতি হলেও সামনে আরও ‍দুটি শৈত্যপ্রবাহ আসতে পারে। তখন আবার দেশজুড়ে তীব্র শীত অনুভব হতে পারে।

বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়া পূর্বাভাসে বলা হয়, রাজশাহী, পাবনা, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া অঞ্চলসমূহের ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে সারাদেশের রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যাওয়ার কারণে দেশের উত্তর, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চলে মাঝারি থেকে তীব্র শীতের অনুভূতি অব্যাহত থাকতে পারে।

বাংলাদেশ সময়: ১৮২৪ ঘণ্টা, জানুয়ারি ৫, ২০২৩
এসসি/আরএইচ
 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।