ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৮ শাবান ১৪৪৫

জাতীয়

বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট কাটানোই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ

শামীম খান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০৫২ ঘণ্টা, জানুয়ারি ৫, ২০২৩
বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট কাটানোই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ

ঢাকা: বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট সংকটের মধ্যে বর্তমান মেয়াদের সরকার আরও একটি বছর পার করলো। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের এই মেয়াদের সরকার চার বছর পার করে ৫ বছরে পা দিচ্ছে।

তবে চলমান বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সৃষ্ট সংকট কাটিয়ে সরকারের মেয়াদ শেষের এ বছরটি সফলভাবে পার করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন নীতি-নির্ধারকরা। বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান সংকট এ বছর আরও প্রকট হয়ে দেখা দেবে বলে বার বার সতর্ক করছেন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও অর্থনীতিবিদরা।

চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতির এক তৃতীয়াংশ মন্দার কবলে পড়বে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বছরের শুরুতেই সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, গত বছরের চেয়ে ২০২৩ আরও ‘কঠিন’ হবে।  

বিবিসির এক প্রতিবেদনে জর্জিয়েভার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীন তাদের অর্থনীতিকে ধীরগতিতে দেখছে।

জর্জিয়েভা বলেন, আমরা ধারণা করছি বৈশ্বিক অর্থনীতির এক তৃতীয়াংশ মন্দার সম্মুখীন হবে। এমনকি যেসব দেশ মন্দার মুখোমুখি হয়নি, তারাও কয়েক লাখ মানুষের জন্য মন্দার সম্মুখীন হওয়ার মতো অনুভব করবে। ২০২৩ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনও একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে সরকার সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার চলমান ধাক্কা বিশেষ করে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব অনেক আগেই বাংলাদেশেও পড়েছে। এই বিশ্ব মন্দা পরিস্থিতি আরও প্রকট হলে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশে এ সংকট আরও বাড়বে। চলমান পরিস্থিতি সরকার গত এক বছর ধরে পার করে নিচ্ছে। এটা আরও প্রকট হলে পরিস্থিতি কোথায় এবং কোন পর্যায়ে যাবে, সেটা নিয়েই উদ্বিগ্ন সরকারের নীতি-নির্ধারকরা।

এ বছরের শেষেই আওয়ামী লীগ সরকারের চলতি মেয়াদের ৫ বছর পূর্ণ হবে। এ নিয়ে টানা তিন মেয়াদ পার করতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সরকারের এই তৃতীয় মেয়াদের একটা বড় সময়জুড়ে বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ এর কারণে সৃষ্ট সংকট পার করতে হয়েছে।  

২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের এই তৃতীয় মেয়াদের সরকারের যাত্রা শুরু হয়। এর এক বছর পরই বিশ্বব্যাপী শুরু হয় করোনা সংকট। এর আঘাতে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিধারা স্থবির হয়ে পড়ে। দুই বছর করোনার অর্থনৈতিক সংকট চলমান থাকতেই শুরু হয় ইইক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। গত ২৪ ফ্রেব্রুয়ারি থেকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং নিষেধাজ্ঞা আরোপ বিশ্ব অর্থনীতিতে আরেকটি ধাক্কা যুক্ত হয়। এর ফলে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও।  

এই বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা এ বছর আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে এবং বাংলাদেশে এর প্রভাব সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত কয়েক মাস আগে থেকেই বার বার সবাইকে সতর্ক করেছেন।

এই পরিস্থিতির মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকার চলতি মেয়াদের শেষ বছরে পদার্পণ করলো। আগামী বছর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সে হিসেবে এ বছরটি নির্বাচনের বছর হওয়ায় এই অর্থনৈতিক সংকট সরকারের জন্য আরও চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারাও বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত।  

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ বাংলানিউজকে বলেন, এ বছর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সারা বিশ্বেই জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, আমাদের দেশেও তার প্রভাব পড়েছে। এ বছর বিশ্বব্যাপী চলমান অনৈতিক মন্দা আরও প্রকট হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা আগে থেকেই সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ বছর মার্চের মধ্যে এই সংকট তীব্র হবে। তবে আমাদের সরকার এই সংকট কাটিয়ে ওঠার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা আশা করছি, সরকার সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালও নতুন বছর দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। গত ১ জানুয়ারি তিনি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে বলেন, নতুন বছরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। সেটা কো-অর্ডিনেশন কমিটির সভায় সংশোধন করে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। তবে, আমি আশাবাদী, প্রবৃদ্ধি আরও বেশি হবে।

এদিকে করোনার পর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও গত বছরটি সরকার ভালোভাবেই পর করছে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা। সার্বিক বিবেচনায় সরকার সফল বলেই জানান তারা। সেইসঙ্গে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে গত এক বছর যেভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, এ বছরেও সেটা অব্যাহত থাকবে বলে তারা আশা প্রকাশ করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক বাংলানিউজকে বলেন, অর্থনৈতিকভাবে বিশ্ব পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিলো না। তারপরও বলবো যে, করোনা পরিস্থিতি কমে যাওয়ায় এবং সহনীয় পর্যায়ে চলে আসায় আমরা অনেকটা ভালো ছিলাম। তবে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে, জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়াও সারা বিশ্বেই অন্য সব জিনিসের দাম বেড়ে যায়। তারপরও আমি বলবো, সকল বিবেচনায় এই এক বছর ভালোভাবেই পার করেছি। দুর্ভিক্ষ হয়নি, খাদ্যের হাহাকার হয়নি, বিপর্যয় হয়নি। বিশ্বের চলমান মন্দা এ বছর আরও বাড়বে অনেকেই এমন আশঙ্কা করছেন। আমাদেরও হয়তো অসুবিধা হবে, কারণ এই সময়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ ভালো হয়নি, বৈদেশিক বাণিজ্যেও সংকট ছিলো। তবে আমাদের বোরো ধানের ফলন ভালো হয়েছে। আগামীতেও সারের সমস্যা হবে না আশা করছি। নানা দিকে সংকট থাকতে পারে, তবে সব মিলিয়ে আমরা যে ধারায় চলছি, তা অব্যাহত থাকবে আশা করছি।

এ বিষয়ে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, সরকারের এই মেয়াদের চার বছর হলো। প্রথম বছরটা আমরা ভালোভাবেই কাটিয়েছি। মানুষের যে প্রত্যাশা, তার একটা সুবাতাস প্রবাহিত হয়েছিলো। বিশ্বব্যাপী কোভিড সংকট, তার পর যুদ্ধের কারণে যে সংকট- সেগুলো সরকার সফলতার সঙ্গেই পার করেছে। এই সফলতার ধারাবাহিকতায় বলতে পারি, আগামীতেও দেশের মানুষের জন্য ভালো কিছু অপেক্ষা করছে। কারণ আমরা বিশ্বের বেস্ট লিডারশিপ শেখ হাসিনার অধীনে আছি। উই ক্যান (আমরা পারি)- এই কনসেপ্টে শেখ হাসিনা চলছেন। শেখ হাসিনা আমাদের বড় ভরসা। এদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর ওপর ভরসা রেখে যেমন স্বাধীনতা পেয়েছেন, এই মুহূর্তে সেই ধরণের ভরসার জায়গা হচ্ছেন শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশ সময়: ২০১৫ ঘণ্টা, জানুয়ারি ৫, ২০২৩
এসকে/এনএস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।