ঢাকা, সোমবার, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২০ মে ২০২৪, ১১ জিলকদ ১৪৪৫

জাতীয়

চিংড়ি ঘেরের লবণ পানিতে কৃষকের সর্বনাশ

এস এস শোহান, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২১৩০ ঘণ্টা, মার্চ ২৪, ২০২৩
চিংড়ি ঘেরের লবণ পানিতে কৃষকের সর্বনাশ

বাগেরহাট: বাগেরহাটে স্লুইচ গেট দিয়ে ওঠানো লবণ পানিতে মরছে কৃষকের ধান। গেল কয়েকদিনে বাগেরহাট সদর উপজেলার ডেমা ইউনিয়নের অন্তত ৩০০ বিঘা জমির ধান পচে গেছে।

ডেমা ইউনিয়নের বাসবাড়িয়া ও ছবাকি স্লুইচ গেট দিয়ে ছবাকি নদীতে সপানি প্রবেশ করানোর কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে ডেমা, পিসি ডেমা, কাশিমপুর, খেগড়াঘাট, বেতবুনয়িাসহ কয়েকটি গ্রামের অন্তত তিন শতাধিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। এর মধ্যে কাশিমপুর মৌজায় থাকা সরকারি সহযোগিতাপ্রাপ্ত ব্লকের ধানও নষ্ট হয়ে গেছে। মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসে ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকরা।

স্থানীয় কৃষক মো. সুজন শেখ বলেন, কাশিমপুর মাঠে চার বিঘা ধান রোপণ করেছিলাম। সেখানে আমার প্রায় ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। আমার জমি কৃষি বিভাগের সহায়তাপ্রাপ্ত ব্লকের মধ্যে ছিল। কৃষি বিভাগের করা সেচ লাইন দিয়ে পানি দিয়েছি। তারপরেও আমার ধান মরেছে। নদীতে লবণ পানি প্রবেশ করানোয়, সেচ লাইনেও লবণ পানি আসছে।

খেগড়াঘাট মাঠে দুই বিঘা জমিতে ধান চাষ করা দিলিপ কুমার মণ্ডল বলেন, অনেক কষ্ট করে ধান লাগিয়েছিলাম। পানি উঠিয়ে সব শেষ করে দিল।

শুধু দিলিপ আর সুজন নয়, লবণ পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আজাদ মল্লিক, নিখিল মণ্ডল, কালাম মল্লিকসহ অনেক কৃষক। তাদের সবার ফসল এভাবে নষ্ট হয়ে গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক বলেন, আমরা যেসব জমিতে ধান চাষ করেছি, সেসব জমি বেড়িবাঁধের মধ্যেই। লবণ পানি আর ঝড়জলচ্ছাস থেকে আবাদ বাঁচাতে বেড়িবাধ দেওয়া হয়। সেই বেড়িবাঁধের স্লুইচ গেট দিয়ে যদি চিংড়ি চাষের জন্য লবণ পানি উঠিয়ে ধান নষ্ট করা হয়, তাহলে কৃষকরা কোথায় যাবে? যে অবস্থা হয়েছে তাতে কৃষকরা এখন না খেয়ে মরবে।

স্লুইচ গেট থেকে কে লবণ পানি ঢুকিয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে কথা বলতে রাজি হননি কেউ। তবে স্থানীয়ভাবে খোজ নিয়ে জানা গেছে, ডেমা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেনসহ স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ছবাকি ও বাসবাড়িয়া স্লুইচ গেট নিয়ন্ত্রণ করেন। তারাই তাদের প্রয়োজনে লবণ পানি প্রবেশ করান।

তবে লবণ পানি প্রবেশ করানোর বিষয়টি অস্বীকার করে ডেমা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, কৃষকদের সম্মতিতে মাঘি পূর্নিমার সময় এসব গেট থেকে পানি ঢুকানো হয়েছিল। কারণ তখন পানি মিস্টি ছিল। এরপরে আর কোনো পানি ঢুকানো হয়নি। মূলত মাটির তল থেকে ওঠা একটি অপরিচিত পোকার আক্রমনে ধান মারা যাচ্ছে। চাষীরা ভুল বুঝে লবণ পানির কথা বলছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুম বিল্লাহ বলেন, লবণ পানি যাতে প্রবেশ না করতে পারে সে জন্য আমরা গেট বন্ধ করে দিয়েছি। কিন্তু রাতের আধারে কে বা কারা গেট খুলে লবণ পানি প্রবেশ করায় তা আমরা জানি না। শুনেছি তারা নকল চাবি বানিয়েছে। তবে বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি।

এদিকে গেল ০৮ মার্চ বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার রাজনগর ইউনিয়নের ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে থেকে যাওয়া কালেখারবেড় এলাকার ঘরের খালের বাঁধ কেটে মৎস্য ঘেরে পানি ঢোকানো হয়। এর কারণে রাজনগর ও পেড়িখালী ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের অন্তত ৩০০ বিঘা জমির ইরি ধান নষ্ট হয়ে যায়। পরে ১০ থেকে ১২ মার্চের মধ্যে হাড়িখালীসহ পাশাপাশি তিনটি স্লুইচ গেট থেকে পুটিমারি বিলে লনব পানি ঢোকায় হাড়িখালী ক্ষুদ্র পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি। পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির খামখেয়ালীপনার ফলে পুটিমারি বিলের অন্তত ২০০ বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়ে যায়।

বাগেরহাট সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাদিয়া সুলতানা বলেন, ডেমা ইউনিয়নের এই মৌসুমে প্রায় ৬০০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে কিছু ধান মারা গেছে। আমরা কৃষকদের জমির মাটি পরীক্ষা করেছি। মাটিতে লবনের পরিমান অনেক বেশি। এ বছর বৃষ্টিপাত কম হওয়ার কারণে মাটির লবণ কাটেনি। এছাড়া স্লুইচ গেট দিয়ে লবণ পানি প্রবেশের কোনো প্রমান আমাদের কাছে নেই। তারপরেও আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয়দের সঙ্গে সমন্বয় করার চেষ্টা করছি যাতে কোনো কৃষকের ক্ষতি না হয়।

বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুবাইয়া তাসনিম বলেন, ইতোমধ্যে উপজেলা কৃষি বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারা পুরো এলাকা সরেজমিনে দেখবে এবং ক্ষতির পরিমাণ নিরুপন করে জানাবে। এসব গেট থেকে যাতে লবণ পানি ঢুকাতে না পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ সময়: ২১২৯ ঘণ্টা, মার্চ ২৪, ২০২৩
এফআর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।