ঢাকা, শনিবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ১৮ মে ২০২৪, ০৯ জিলকদ ১৪৪৫

মুক্তমত

সেই রিপোর্ট তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক  | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৪০১ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৩
সেই রিপোর্ট তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে

‘আমার নাতনি একটি বাচ্চা মেয়ে, তোমরা একজন একজন করে আসো। ’ বৃদ্ধা দাদির সেই আকুতি মন গলাতে পারেনি বিএনপি-জামায়াত পাষণ্ডদের।

অল্প বয়স্ক হিন্দু মেয়েটিকে তারা গণধর্ষণ করেছিল। পূর্ণিমা শীলকে তার বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়েও গণধর্ষণ করেছিল এসব অসুররা। এমনই বহু নির্মম ঘটনা স্থান পেয়েছে মো. সাহাবুদ্দিন কমিশনের দেড় হাজার অধিক পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে, যে প্রতিবেদনে পাঁচ শতাধিক নির্যাতকের পরিচয় উল্লেখ রয়েছে।  ঘটনাগুলোর সূত্রপাত হয়েছিল ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জয়লাভ করার আগে এবং পরে, শুরু হয়েছিল সে সময়ের তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান কুখ্যাত বিচারপতি লতিফুর রহমান ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ই।

অতঃপর খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পরেও সেই তান্ডব চলতে থাকে সরকারের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা, মদদ, আনুকূল্য এবং পৃষ্ঠপোষকতায়। কয়েক শ হিন্দুকে হত্যা করা হয়েছিল, ধর্ষণ করা হয়েছিল শতাধিক নারীকে, পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল শত শত বাড়ি। কয়েক হাজার হিন্দুকে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। কেউ মামলা করতে গেলে পুলিশ বলত মামলা না নেওয়ার জন্য ওপরের নির্দেশ রয়েছে। পরবর্তীতে মহামান্য হাই কোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে উক্ত নারকীয় ঘটনাগুলোর তদন্তের জন্য কমিশন নিয়োগ করার আদেশ প্রদান করলে সরকার সেই সময়ে অবসরে যাওয়া জেলা জজ মো. সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে এক সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিশন গঠন করে। তদন্তকালে তাকে হাজারো প্রতিবন্ধকতা ভেদ করতে হয়েছিল। হুমকি-ধমকি ছাড়াও ভুক্তভোগীদের সাক্ষী দিতে আসতে দেওয়া হয়নি। বহু অপরাধী আওয়ামী লীগ সদস্য সেজে মো. সাহাবুদ্দিনকে ভুয়া তথ্য দিয়ে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সব প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে মো. সাহাবুদ্দিন তৈরি করেছিলেন এক মহামূল্যবান ঐতিহাসিক তদন্ত প্রতিবেদন। ২০০১-এর নির্বাচন-পরবর্তী বর্বরতা বিশ্ব বিবেককেও প্রকম্পিত করেছিল। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের নেতৃত্বে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন, যাতে বহু বিদেশি মানবাধিকার নেতা-কর্মী উপস্থিত থেকে সংঘটিত পৈশাচিকতার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।

সবাই বলেছেন, ভবিষ্যতে গবেষণার জন্য এটি এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। রিপোর্টটি ২০০১-এর নির্বাচনকালীন বর্বরতা সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে সম্যক ধারণা দিতে পারবে। এ রিপোর্ট মৃত্যুঞ্জয়ী করেছে প্রতিবেদক মো. সাহাবুদ্দিনকে, যিনি আর কয়েক সপ্তাহ পরেই দেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের জন্য শপথবাক্য পাঠ করবেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রণীত এ রিপোর্ট প্রমাণ করে মো. সাহাবুদ্দিনের প্রজ্ঞা, মেধা, নিষ্ঠা, সংবিধান, গণতন্ত্র, মানবতা, আইনের শাসন, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি তাঁর আনুগত্য অখণ্ডনীয়। একজন প্রকৃত মুজিবসেনা হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ পদ তাঁরই প্রাপ্য, যে সিদ্ধান্ত নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ মুক্তিযুদ্ধপন্থি সবার প্রশংসা কুড়িয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের সদস্য থাকাকালে তিনি সততা, ন্যায়নিষ্ঠা এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপসহীনতার প্রত্যয় প্রমাণ করেছেন। বহু ক্ষমতাধর ব্যক্তির চাপ উপেক্ষা করে তিনি দুর্নীতিবাজদের বিচারে আনার ব্যবস্থা করেছেন। অন্যদিকে নিরপরাধ ব্যক্তিরা যাতে অন্যায়ভাবে হয়রানির শিকার না হয় সে ব্যবস্থাও করেছেন। পদ্মা সেতু নিয়ে তাঁর ওপর দেশি এবং বিদেশি    প্রভাবশালী মহলের চাপ ছিল যেন সে সময়ের মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সচিব এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর (কায়সার) বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তাদের অন্যায় যুক্তি ছিল তা করা হলেই বিশ্বব্যাংকের ঋণ পাওয়া যাবে।

মো. সাহাবুদ্দিনের পরিষ্কার জবাব ছিল, বিশ্বব্যাংককে খুশি করার জন্য তিনি অন্যায় করবেন না, আর তাই উল্লিখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বিধায় তিনি তাদের মিথ্যা অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে কানাডার আদালত এসব নিষ্কলুষ অভিযুক্তদের বেকসুর খালাস দেওয়ায় এটি সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে প্রমাণিত হয়েছে যে, মো. সাহাবুদ্দিনের সিদ্ধান্ত ছিল নির্ভুল। তাঁর সততা, ন্যায়ের প্রতি আনুগত্য এবং বহু বছর বিচারকের দায়িত্ব পালন করার কারণেই তিনি এ ধরনের আইন এবং তথ্য সমর্থিত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।

১৯৯০ দশকের শেষ দিকে যখন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাটির শুনানি হাই কোর্ট বিভাগে চলমান তখন আমি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে সেই মামলা পরিচালনার জন্য ভারপ্রাপ্ত ছিলাম এবং সে মর্যাদায় জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সিরাজুল হকের নেতৃত্বে প্রসিকিউশন দলের সদস্য হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলাম। সে সময়ে মো. সাহাবুদ্দিন আইন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন। এটি ছিল মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে তাঁর সরকারি দায়িত্বেরই অংশ। তখন থেকেই মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা আর সেই সুবাদেই জানার সুযোগ হয়েছে তিনি কত প্রজ্ঞাবান একজন মানুষ, জানার সুযোগ হয়েছে সংবিধান, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শসহ সব মঙ্গলকর বিষয়ের প্রতি তাঁর নি-দ্র আনুগত্যের কথা। মহামান্য রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য যেসব গুণাবলি, দক্ষতা এবং যোগ্যতা দরকার, তার সবই মো. সাহাবুদ্দিনের মধ্যে রয়েছে।

একটি কুচক্রী মহল যারা অন্যায় এবং মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে যে কোনো উপায় অবলম্বন করে বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য বদ্ধপরিকর। যাদের বিরাট অংশ অথবা তাদের পূর্ব পুরুষগণ ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিলেন, পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টি মেনে নিতে পারেননি, তারাই আজ অন্য কিছু না পেয়ে বলতে শুরু করেছেন যে, মো. সাহাবুদ্দিন দুদকের কমিশনার ছিলেন বলে মহামান্য রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করতে পারেন না।

কেননা দুদকের আইনে বলা আছে অবসরে যাওয়ার পরে কমিশনারগণ প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদ গ্রহণে অক্ষম হবেন। তাদের এ ধরনের যুক্তি সত্যি হাস্যকর যা দ্বারা তাদের সংবিধান এবং আইনে অজ্ঞতাই প্রমাণ করছে। সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদে পরিষ্কারভাবে বলা আছে- রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীসহ আটটি পদ লাভজনক হিসেবে গণ্য হবে না। এ আটটি পদের মধ্যে রয়েছে সাংবিধানিক পদে কর্মরত ব্যক্তিগণ। আবু বকর সিদ্দিকী বনাম বিচারপতি মো. সাহাবুদ্দীন মামলায় রায় প্রদানকালে মহামান্য হাই কোর্ট অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছিলেন যে, রাষ্ট্রপতিসহ সাংবিধানিক পদে কর্মরত ব্যক্তিগণ প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা নন। সেই মামলার রায়ে আরও বলা হয়েছে যে, সংবিধানের ৬৬ (৩) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী হওয়ার কারণে উল্লিখিতগণ কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত বলে গণ্য হবেন না মর্মে যে কথাগুলো রয়েছে সেগুলো শুধু সীমিত ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে রিটকারীর বিজ্ঞ আইনজীবী যে যুক্তি উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন তা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। সেই রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী তারাই যারা সরকার দ্বারা নিয়োজিত, যার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, সর্বনিম্ন একজন পিয়ন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ সব সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী-কর্মকর্তা বলে বিবেচিত হবেন। কিন্তু সাংবিধানিক পদে কর্মরত কোনো ব্যক্তি প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন না, আর সেই অর্থে মহামান্য রাষ্ট্রপতি পদটি সাংবিধানিক পদ হওয়ায় সেটিও প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তার পদ নয়।

পূর্বে বিচারপতি নুরুল ইসলাম মহোদয় রাষ্ট্রের উপ-রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হলে তাঁর পদায়নকে চ্যালেঞ্জ করে রিট মামলা করা হলে সেই রিট খারিজ করে মহামান্য হাই কোর্ট একই রায় দিয়েছিলেন। শামসুল হক চৌধুরী বনাম বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফের মামলায় রিট পিটিশনটি খারিজ করে মহামান্য হাই কোর্ট পরিষ্কার ভাষায় বলেছিলেন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণসহ সাংবিধানিক পদে কর্মরত কোনো ব্যক্তিই প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা নহেন। উল্লেখযোগ্য যে, সংবিধানের ৯৯ (১) অনুচ্ছেদে বলা আছে- সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ অবসরে যাওয়ার পর প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না। তাই বিচারপতি নুরুল ইসলামের রাষ্ট্রের উপ-রাষ্ট্রপতি হওয়ার, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণের এবং বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফের প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদ সমাপ্তির পর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির পদ গ্রহণে সাংবিধানিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে মহামান্য হাই কোর্ট উপরে উল্লিখিত রায়গুলোতে পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছিলেন যে, মহামান্য রাষ্ট্রপতি, উপ-রাষ্ট্রপতি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদগুলো সাংবিধানিক পদ হওয়ায় তারা কেউই প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা নন এবং তাই তাদের বেলায় উল্লিখিত বিধিনিষেধ প্রযোজ্য নহে। নিশ্চিতভাবে মহামান্য রাষ্ট্রপতির পদটি সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ হওয়ায় তাঁর পদকেও প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তার পদ হিসেবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই।  যারা মো. সাহাবুদ্দিনের মহামান্য রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণের ব্যাপারে সাংবিধানিক অক্ষমতার অবান্তর কথা বলে জনগণকে প্রতারিত করার চেষ্টায় লিপ্ত, এ ধরনের মূর্খতাসুলভ কথা বলার আগে তাদের উচিত ছিল সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো  এবং মহামান্য হাই কোর্টের উল্লিখিত রায়গুলো পড়ে নেওয়া, যেটি করলে তারা সচেতন জনগণের হাসির পাত্রে পরিণত হতেন না।

লেখক: আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি

বাংলাদেশ সময়: ১৪০০ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৩
এসআইএস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।