ঢাকা, রবিবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ১৯ মে ২০২৪, ১০ জিলকদ ১৪৪৫

মুক্তমত

১৫ আগস্ট: বাঙালির আত্মজিজ্ঞাসার দিন

প্রফেসর অমিত রায় চৌধুরী | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৮৪৩ ঘণ্টা, আগস্ট ১৫, ২০২৩
১৫ আগস্ট: বাঙালির আত্মজিজ্ঞাসার দিন

পনেরো আগস্ট। বিশ্বের যেখানেই বাঙালি বাস করছেন, বিশ্বাস করি, সারা দিনে একবার হলেও আজ এক অবিসংবাদী নেতার কথা মনে পড়েছে।

হয়তো এমন কিছু লেখায় চোখ বুলিয়েছেন বা শুনেছেন, যা অনেক স্মৃতি উসকে দিয়েছে। বিমোহিত চেতনায় ভেসে এসেছে সেই জাদুকরী শব্দের মিছিল।

‘জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা কিছু আছে, আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। ’ মুখের ভাষা, প্রাণের ভাষা সোজা গিয়ে বিঁধেছে লাখ জনতার মর্মস্থলে। নিমিষেই উত্তাল হয়ে উঠেছে জনসমুদ্র, শোনা গেছে দিগন্ত কাঁপানো গর্জন, যা কেবলই নিঃশর্ত সম্মতি ও আস্থার উদযাপন। উত্তেজনায় রক্তকণিকা অস্থির। শিরা-উপশিরা টানটান। নেতৃত্বকে প্রস্তুত করলেন রাজনীতির জাদুকর। স্বাধীনতার বার্তা ভাসিয়ে দিলেন বেতার তরঙ্গে। নিজেকে উৎসর্গ করলেন। মুখোমুখি হলেন পাকিস্তানি জল্লাদদের। ঋজুদেহে হেঁটে গেলেন শত্রুর কারাগারে। চারপাশে মৃত্যুর জমাট বাঁধা অন্ধকার।

অথচ তিনি নির্ভয়, অবিচল। দেশের মাটি-প্রকৃতির সঙ্গে এ মানুষটির নাড়ির বন্ধন। ধারণ করেন অসাধারণ রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি। সহসাই তিনি ভেবে নিলেন-তার প্রতীকী উপস্থিতি হবে লড়াইয়ের প্রেরণা, মৃত্যুও যদি হয়-হোক, তাও হবে মুক্তিসেনার অজেয় শক্তি, তার প্রতীক নিয়েই বাঙালি মরণপণ লড়বে, হয়ে উঠবে মৃত্যুঞ্জয়। তাই কোনো পিছুটান তার ছিল না।

১৬ ডিসেম্বর এক সাগর রক্ত পাড়ি দিয়ে মানচিত্রে ভেসে উঠেছিল লাল-সবুজ পতাকা। শুরু হয় নতুন এক গল্প। এলো ১০ জানুয়ারি। মনে পড়ে শীতের কুয়াশা সরিয়ে উঁকি দিয়েছে সোনাঝরা রোদ্দুর। আরও একটা মাতাল করা দিন। সমগ্র জাতি উদ্বেল, অজানা আকাঙ্ক্ষায় শিহরিত। বীরের বেশে ফিরছেন রূপকথার মহানায়ক। হাজার বছরের শেকল ভেঙে বেরিয়ে এসেছে নতুন দেশ, নতুন আইডেনটিটি। আবার সেই প্রতীক্ষার মুহূর্ত, পাগল করা শব্দতরঙ্গ। এবার কিন্তু সে কণ্ঠে দুর্বোধ্য আবেগ। ‘কবিগুরু, তুমি এসে দেখে যাও, তোমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে। ’ সত্যিই তো, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি তিনি। অবচেতনে নিজের জাতি নিয়ে তার শ্লাঘার কি অন্ত ছিল? কে জানত এখানেই নিহিত ছিল নিয়তির নির্মম রসিকতা! বাঙালির রক্তঋণ রক্ত দিয়েই পরিশোধ করার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন।

তবে কি সে রক্তপাত বরাদ্দ ছিল বাঙালিরই হাতে? সতর্কতার সব বিজ্ঞানকে তিনি হেলায় উড়িয়েছেন। হয়তো তার অভিমানী সত্তা এ শঙ্কাকে আমল দিতে চায়নি। নিজেকে রক্ষার কোনো চেষ্টাই তিনি করেননি। মনের ভেতরে আবেগ যন্ত্রণাকে বৃষ্টি ছাড়া কি প্রকাশ করা যায়? প্রকৃতিও তাই সেদিন অঝোরে কেঁদেছিল। এক বুক কান্না আর এক আকাশ বৃষ্টি সেদিন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। জগৎজুড়ে আজ একরাশ বিষণ্ণতা। তবু মনের কোণে ভিড় করছে অনেক প্রশ্ন। জাতি হিসাবে সেসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের খুঁজতেই হবে।

বঙ্গবন্ধুকে প্রাণ ঝরাতে হলো কেন? পাকিস্তান ভাঙার শাস্তি? নাকি বাঙালির হাতে লজ্জাজনক পরাজয়ের প্রতিশোধ? বাঙালি নিধনে পাকিস্তানকে মদদ দিয়েছিল আমেরিকা-চীন। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা-ঠাণ্ডযুদ্ধের সময় ছিল এসব অনর্থক রেটরিক। কৌশলগত কারণেই ভারত-রাশিয়া আমাদের পাশে। বাংলার জয় মানেই তো হানাদারের পরাজয়। পাকিস্তানের ঢাল ছিল ধর্ম। লক্ষ্য ছিল ঔপনিবেশিক শোষণ। বাঙালিকে পাকিস্তানি বানানোর ইচ্ছাও তাদের ছিল না। ছিল বর্ণের আভিজাত্য। দৃষ্টিভঙ্গিতে জাতিগত বিদ্বেষ। এমনকি পাকিস্তান সৃষ্টিতেও তাদের তেমন সায় ছিল না। বাংলা ছাড়া বাকি চার প্রদেশ লাহোর প্রস্তাবে ভোটও দেয়নি।

 ’৪৭-এ সব হিসাব পালটে গেল। নয়া উপনিবেশ পেয়ে পাকিস্তানি এলিটরা বেজায় খুশি। বাংলার সম্পদে ফুলে ফেঁপে উঠল পশ্চিম পাকিস্তান। মুসলিম লীগ-জামায়াতের মতো দলগুলোর তাতে কষ্ট ছিল না। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময়ও চাঁদ-তারার পক্ষেই ছিল তাদের অবস্থান। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আমলে এ দালালরা কাতর হয়ে সুবিধা বুঝে নিতে কসুর করেনি। শুধু রাজনীতিজীবীরা নয়, চাকরি থেকে ব্যবসা-সবাই মতলব হাসিলে মশগুল। কারণ পাঞ্জাবিরা নেই। মাঠ ফাঁকা। আবার ’৭৫-র পর ভোল পালটাতে এদের একটুও দেরি হয়নি। এদিকে পরাজিত বিদেশি শক্তির ভূ-রাজনৈতিক ক্ষতি ছিল অপরিমেয়।  

পরিস্থিতি কব্জায় আনার পথে হিমালয়ের মতো বাধা বঙ্গবন্ধু। দেশের মধ্যে নীতিহীন বাম-ডানের গাঁটছড়া মজবুত। সবচেয়ে বড় শত্রু দুর্নীতিবাজ, লুটেরা শ্রেণি। বঙ্গবন্ধু বারবার বলেছেন, আরও একটা মুক্তিযুদ্ধ দরকার। তা হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে। বড় একা লেগেছিল তাকে। তবুও তার অবস্থান পরিষ্কার। কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের পক্ষে। সংকল্প একটাই-বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত সমাজ। জীবদ্দশায় জনসমর্থনে কখনো ভাটা দেখেননি। যেখানেই গেছেন অবিশ্রান্ত জনস্রোত, অবিশ্বাস্য উন্মাদনা। তাই তো খুনিরাও সেদিন স্বীকার করেছে-তাকে হত্যার বিকল্প ছিল না। নিষ্পাপ শিশুকে বাঁচিয়ে রাখাতেও তারা ঝুঁকি দেখেছিল।

এই হলো গণতন্ত্র উদ্ধারের নমুনা! এরপর ইনডেমনিটি। সভ্যতার ইতিহাসে এমন নিকৃষ্ট কলঙ্কের নজির নেই। একটুও ভাবিনি এই হিংস তা ও জঘন্য প্রতারণাকে সভ্যজগৎ কীভাবে দেখেছে। দুর্বৃত্তকে সাংবিধানিক আশ্রয় দেওয়ায় দেশের সব অর্জন কীভাবে ধুলোয় লুটিয়ে গেছে। গণতন্ত্র-সুশাসনের দাবি আমাদের কীভাবে উপহাস করে। ঘাতকের দল বলে বেড়ায়-এ তো আওয়ামী লীগের কাজ। বেশ! কেন সে আইন টিকে থাকে ’৯৬ পর্যন্ত? কেন বঙ্গবন্ধুর ঘাতকরা পুরস্কার পায়? কেন ছাড়া পায় ১১ হাজার যুদ্ধাপরাধী? কেন গোলাম আজম ফেরে দেশে? কেন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী পুনর্বাসিত হয়? বঙ্গবন্ধুর নাম পাঠ্যপুস্তক থেকে উধাও হয়ে যায়? জনস্মৃতি থেকে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে মুছে ফেলার পরিকল্পিত চেষ্টা। যারা গণতন্ত্রের জন্য গলা ফাটায়, ভোটের অধিকারের কথা বলে, তারা কি ভেবে দেখেছে ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং এদেশে কখন কীভাবে শুরু হলো? কীভাবে জনমতকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে? মিথ্যা আর চাতুরি দিয়ে ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে? তৎকালীন রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, এমনকি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও কি এ স্খলনের দায় এড়াতে পারে? স্বাধীনতার ঘোষক সংক্রান্ত অহেতুক বিতর্ক জিইয়ে রাখা হয়েছে। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ রেহমান সোবহানের মতে, বৈধ কর্তৃত্ব ও ম্যান্ডেট ছাড়া নিছক ঘোষণা মূল্যহীন; যার কোনো রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি থাকে না। বঙ্গবন্ধুর জন্য এখন মাঝেমধ্যে মায়াকান্না শুনি। তিনি ছিলেন উদার, সহনশীল। ঠিকই তো! ইউরোপ, আমেরিকা, এমনকি এশিয়াতেও স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষে দেশবিরোধী দালালদের নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু তা করেননি। শুধু পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক নয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের দালালি করেও যে আমলারা বঙ্গবন্ধুর দয়ায় নিজ নিজ পদে ফিরেছিলেন, ’৭৫ পরবর্তী সব অপকর্মের অংশীদার তারাও। তার ঔদার্য ও মানবতা তো এ হায়নাদের ছোবল থেকে তাকে রক্ষা করতে পারেনি। এটাও হয়তো ইতিহাসের বড় শিক্ষা।

অবাক হয়েছি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর রহস্যজনক নীরবতা দেখে। শিশুমনকে বোঝাতে পারিনি কেন মানুষের ঢল রাস্তায় নেমে আসেনি? কেন স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার, অফিস-আদালত এখনো খোলা? অথচ দেখুন, জার্মান চ্যান্সেলর হেলমট স্মিথ বলে উঠলেন- এ জাতিকে আর বিশ্বাস করা যায় না। সাদ্দাম হোসেন রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করলেন। টাইম ম্যাগাজিন বলল- এই যদি হবে তাহলে এদের কেন দরকার পড়ল স্বাধীন একটা রাষ্ট্রের? এরপর শোকের ঝড় উঠল ল্যাটিন আমেরিকা থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ থেকে এশিয়া-সর্বত্র। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মিতেরঁ ১৯৮৯ সালে ঢাকায় এলে প্রেসিডেন্ট এরশাদ একটি ছবি দেখিয়ে বঙ্গবন্ধুকে পরিচয় করাতে চান। মিতেরঁ বলেছিলেন- শুধু তিনি নন, গোটা বিশ্ব তাকে চেনে। জানতে চেয়েছিলেন, তার নামের পরে ‘দ্য গ্রেট’ শব্দবন্ধটি কেন ব্যবহার করা হয়নি? প্রেসিডেন্ট এরশাদ বিলক্ষণ বিব্রতই হয়েছিলেন। সেদেশেরই এক রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন, একজন বীরের নাম মুখে নিয়ে যে জাতি প্রবল পরাশক্তির মদদপুষ্ট সশস্ত্র বাহিনীকে পর্যুদস্ত করতে পারে,সেদেশের উত্থান নিয়ে আমার অন্তত কোনো সংশয় নেই।

বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে অপপ্রচার ছিল-ধর্মনিরপেক্ষতার নামে তিনি ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। সে যুক্তি যে কত অসার, তা আলোচনা করলেই বোঝা যাবে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক থেকে শুরু করে সেনাশাসক ও বিত্তবান।

লেখক: ট্রেজারার, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

বাংলাদেশ সময়: ০৮৪১ ঘণ্টা, আগস্ট ১৫, ২০২৩
এমজে

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।