ঢাকা, শনিবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ১৮ মে ২০২৪, ০৯ জিলকদ ১৪৪৫

মুক্তমত

বঙ্গবন্ধু হত্যার পাঁচ আসামি ১৫ বছরেও দেশে ফেরানো যায়নি! 

মিরাজ মাহবুব ইফতি, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১১৪৬ ঘণ্টা, আগস্ট ১৫, ২০২৩
বঙ্গবন্ধু হত্যার পাঁচ আসামি ১৫ বছরেও দেশে ফেরানো যায়নি! 

ঢাকা: নৃসংসভাবে সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যা করা হয়। জাতির এ কলঙ্কজনক অধ্যায়ের ২১ বছর পর মামলা হয় ১৯৯৬ সালে।

সেই মামলায় ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল আপিলে চূড়ান্ত রায় হয়। সেই রায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামি এখনো রয়েছে বিচারের আওতার বাইরে।

সেই আত্মস্বীকৃত পলাতক পাঁচ খুনি হলেন, এ এম রাশেদ চৌধুরী, নূর চৌধুরী, শরিফুল হক ডালিম, মোসলেম উদ্দিন খান ও খন্দকার আব্দুর রশিদ। পলাতক এই পাঁচ আসামিকে ফেরাতে ২০০৯ সালে ইন্টারপোলের মাধ্যমে প্রথম রেড নোটিস জারি করে বাংলাদেশ পুলিশ। তাদের ফেরাতে ল ফার্মও নিয়োগ করে সরকার। কিন্তু গত ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের ফিরিয়ে বিচারের মুখোমুখি করতে পারেনি।

রেড নোটিস জারির পর যুক্তরাষ্ট্রে থাকা রাশেদ চৌধুরী ও কানাডায় থাকা নূর চৌধুরীর অবস্থান শনাক্ত করা শুধু সম্ভব হয়েছে, তাদের ফেরানো যায়নি। আর ফেরানো তো দূরের কথা বাকি তিন আসামীর অবস্থান ঠিক কোথায় তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃসংসভাবে স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত সহকারি এএফএম মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে রাজধানীর ধানমণ্ডি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় তদন্ত শেষে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের(সিআইডি) তৎকালীন এএসপি আব্দুল কাহার আখন্দ ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি ২০জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর ১৫জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ৫ জনকে অব্যাহতি দেয় আদালত। পরবর্তীতে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলে ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট ১২জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ও ৩ জনকে অব্যাহতি দেয়।

আওয়ামী লীগ সরকার পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ৫ আসামির ফাঁসির কার্যকর করা হয়। তারা হলেন, মেজর(অব.) বজলুল হুদা, লে. কর্নেল(অব.) মহিউদ্দিন আহমেদ, মেজর(অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন, কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান ও কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান।

২০০১ সালের ২ জানুয়ারি জিম্বাবুয়েতে অবস্থানকালে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী লে. কর্নেল(অব.)আব্দুল আজিজ পাশা মৃত্যুবরণ করেন।

২০১০ সালের ৭ এপ্রিল রেড নোটিসধারী পলাতক আসামী লে. আব্দুল মাজেদ(বাধ্যতামূলক অবসর)কে ঢাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের পর ওই বছরের ১২ এপ্রিল ফাঁসির রায় কার্যকর করে সরকার।

কিন্তু দেশ থেকে পলাতক বাকি পাঁচ আসামীকে বিচারের সম্মুখীন করা যায়নি। তাদের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি করেও ফেরানো যায়নি।

পলাতক পাঁচ খুনীকে ফেরাতে রেড নোটিস জারি ২০০৯ সালে:

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত পলাতক পাঁচ খুনি হচ্ছেন- লে. কর্নেল(অব্যাহতি) এ এম রাশেদ চৌধুরী, লে. কর্নেল(অব্যাহতি) এসএইচএমবি নূর চৌধুরী, লে. কর্নেল(অব্যাহতি) শরিফুল হক ডালিম, রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন(অবসর) ও লে. কর্নেল(বরখাস্ত) খন্দকার আব্দুর রশিদ। তারা প্রত্যেকে দেশ থেকে পলাতক। তাদের প্রতেক্যের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়।

 দুবার করে রেড নোটিসেও ফেরানো যায়নি তাদের

লে. কর্নেল(অব্যাহতি) এসএইচএমবি নূর চৌধুরীকে ফেরাতে ২০০৯ সালের ৩১ আগস্ট ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়। তখন তার অবস্থান কাডানায়। সেই রেড নোটিসের মেয়াদ শেষ হলে ২০১৯ সালের ২৫ মার্চ পাঁচ বছরের জন্য মেয়াদ বাড়ানো হয়। কিন্তু তাকে ফেরানো যায়নি।

লে. কর্নেল এ এম রাশেদ চৌধুরীকে ফেরাতে ২০০৯ সালের ৭ জানুয়ারি প্রথম ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়। সেটির মেয়াদ শেষ হলে ২০১৮ সালের ২৬ জুলাই পাঁচ বছরের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। তার অবস্থান আমেরিকায় বলে নিশ্চিত হওয়া গেলেও তাকেও ফেরানো যায়নি।

লে. কর্নেল(অব্যাহতি) শরিফুল হক ডালিমকে ফেরাতে ২০০৯ সালের ২৮ জুন প্রথম ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়। সেটির মেয়াদ শেষ হলে ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি পুনরায় পাঁচ বছরের জন্য মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু তাকে ফেরানো দূরের কথা তার অবস্থানও নিশ্চিত করতে পারেনি ইন্টারপোল কিংবা বাংলাদেশ পুলিশ। তবে পুলিশের ধারণা ডালিমের অবস্থান পাকিস্তান অথবা লিবিয়ায়।

লে. কর্নেল(বরখাস্ত) খন্দকার আব্দুর রশিদকে ফেরাতে প্রথম ২০০৯ সালের ৩১ আগস্ট ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়। সেটির মেয়াদ শেষ হলে ২০১৯ সালের ২৫ মার্চ পাঁচ বছরের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু তাকে ফেরানো দূরের কথা তার অবস্থানও নিশ্চিত হয়নি। তবে পুলিশের ধারণা, আব্দুর রশিদের অবস্থান লিবিয়া অথবা জিম্বাবুয়েতে।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আরেক ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনকে ফেরাতে প্রথম ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয় ২০০৯ সালের জুনে। সেটির মেয়াদ শেষ হলে ২০১৮ সালের ৪ ডিসেম্বর পুনরায় পাঁচ বছরের জন্য মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। তার অবস্থান পাকিস্তানে বলে নিশ্চিত হলেও তাকেও ফেরাতে পারেনি বাংলাদেশ পুলিশ।

এব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) সহকারি মহাপরিদর্শক (এআইজি) শরীফ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই দেশ ছেড়ে পলাতক অপরাধী-আসামিদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা এ কে এম কামরুল আহসান বলেন, এনসিবি’র সঙ্গে ইন্টারপোল ও সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যোগাযোগ অব্যাহত আছে। ইন্টারপোল প্রায়শই সহযোগিতা করে থাকে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীসহ দাগি আসামি, অপরাধী ও দণ্ডপ্রাপ্তদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলমান।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. কামালউদ্দিন আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের ফেরানোর যে কমিটি সেটাতে আমিও ছিলাম। দুজনের অবস্থান জানা গেলেও বাকি পলাতক তিনজনের অবস্থান জানা যাচ্ছে না। ল ফার্ম নিয়োগ করেও যুক্তরাষ্ট্রে থাকা রাশেদ চৌধুরী ও কানাডায় অবস্থান করা নূর চৌধুরীকে ফেরানো যায়নি। সেখানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের তারা ফেরত দেয় না। আমরা ইন্টাপোলে ছবি, সম্ভাব্য হাতের ছাপও  পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু বাকি তিনজনকে ট্রেসই করা যায়নি।

সাবেক এ স্বরাষ্ট্র সচিব আরও বলেন, চাইলেই কাউকে ফিরিয়ে আনা সহজ না। কিন্তু চাইতে তো হবে। ইন্টারপোলে যে ৬২ জনের নাম ঝুলছে তাদের ইন্টারপোল কিন্তু গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশে পাঠাবে না। তাদের দায়িত্ব হচ্ছে খোঁজা। খুঁজে অবস্থান নিশ্চিত হয়ে জানানো। সেটা হচ্ছে না সেটা নিয়মিত মনিটরিং ও খোঁজ রাখার দায়িত্ব পরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি’র। যদি কাউকে ফিরিয়ে আনতে চাই, তিনি যদি ক্রিমিনাল হন, তাহলে সেই দেশের সঙ্গে চুক্তি (বহিঃসমর্পণ চুক্তি) থাকতে হবে।  

খুনিদের অবস্থান প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত ৫ পলাতক খুনির অবস্থানের তথ্য দিতে পারলে তাকে সরকারের পক্ষ থেকে পুরস্কৃত করা হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফেরাতে সরকার সব ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধুর দুই খুনির খবর আমরা জানি। একজন আমেরিকায় এবং আরেকজন কানাডায়। বাকি তিনজন সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। যে এদের তথ্য দেবে সরকার তাদের পুরস্কৃত করবে।

বাংলাদেশ সময়: ১১৪৫ ঘণ্টা, আগস্ট ১৫, ২০২৩

এমএমআই/এমএম 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।