ঢাকা, সোমবার, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২০ মে ২০২৪, ১১ জিলকদ ১৪৪৫

মুক্তমত

বৈশ্বিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে অন্তর্ভুক্তিতে মনোযোগ ভারতের

হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১০৫৭ ঘণ্টা, আগস্ট ১৬, ২০২৩
বৈশ্বিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে অন্তর্ভুক্তিতে মনোযোগ ভারতের হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা

ভারত একটি জটিল ও প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে মর্যাদাপূর্ণ জি২০ প্রেসিডেন্সি গ্রহণ করেছে। আজকের সংকটগুলো বিভিন্ন মাত্রার ও ধরনের।

সংকটগুলো জলবায়ুবিষয়ক হোক বা ভূ-রাজনৈতিক হোক; একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার দিকে জি২০ প্রেসিডেন্ট হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়ার অনন্য সুযোগ আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছে।

ভারত জি৭-এর অংশীদার, ব্রিকস ও কোয়াডের সদস্য।

এসসিও ও জি২০-এর বর্তমান সভাপতি এবং ‘ভয়েস অব দ্য গ্লোবাল সাউথ’ হিসেবে ভারত উন্নয়নশীল দেশ ও উন্নত অর্থনীতির মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক উদ্বেগগুলো সম্মিলিতভাবে মোকাবেলা করার জন্য দীর্ঘস্থায়ী ও অর্থপূর্ণ সমাধান এবং দৃষ্টিভঙ্গি দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের স্বতন্ত্র সম্মান রয়েছে।


বৃহৎ প্রত্যাশাগুলো

একটি বৃহৎ উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে, শাসনব্যবস্থা ও ১০০ কোটিরও বেশি জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য উদ্ভাবনী ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে ভারত বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিবন্ধকতাগুলোর সমাধান দিতে পারবে—এমন প্রত্যাশা ভারতের কাছে আছে। ভারতের এই দায়িত্ব ক্রমবর্ধমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কারণ আট দশক ধরে বর্তমান বৈশ্বিক শাসন কাঠামো গত কয়েক বছরের সংকট সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘আমাদের এটিও স্বীকার করতে হবে যে এই ব্যর্থতার করুণ পরিণতি সবচেয়ে বেশি ভোগ করছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। বছরের পর বছর ধরে অগ্রগতির পর, আমরা আজ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছি। ’

তাই ভারতের জি২০ সভাপতিত্বের অগ্রাধিকার হলো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই বৈশ্বিক ভবিষ্যৎ গঠন করা এবং বিভিন্ন খাতে ভারতের সেরা অনুশীলনগুলো ভাগ করে নেওয়া।

এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাটি গত বছর বালিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ভারতের জি২০ সভাপতিত্ব হবে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক, উচ্চাভিলাষী, সিদ্ধান্তমূলক ও কর্মমুখী। ’
অন্তর্ভুক্তির এই অনুশীলনটি রাজধানীতে সীমাবদ্ধ না রেখে ভারতের প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে জি২০ বৈঠক আয়োজন করার সিদ্ধান্ত দিয়ে শুরু হয়। এখন পর্যন্ত ভারতের ৪৮টি স্থানে ১৩১টি জি২০ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ভারতের জি২০ প্রেসিডেন্সির মূলসুর ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ বা ‘এক পৃথিবী এক পরিবার এক ভবিষ্যৎ—মহা উপনিষদের প্রাচীন সংস্কৃত পাঠ থেকে গৃহীত হয়েছে।

এই মূলসুরটি মূলত জীবনের সমস্ত মূল্য-মনুষ্য, প্রাণী, উদ্ভিদ ও অণুজীব এবং এই পৃথিবী ও বৃহত্তর মহাবিশ্বে তাদের আন্ত সংযুক্তিকে নিশ্চিতভাবে সমর্থন করে।
মূলসুরটি ভারতের জি২০ প্রেসিডেন্সির একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করছে। এটি হলো ভারত বিশ্বের সবার জন্য ন্যায়সংগত ও যথার্থ উন্নয়নের জন্য প্রয়াস চালাচ্ছে। আমরা, ভারত এই অস্থির সময়ে, একটি টেকসই, সামগ্রিক, দায়িত্বশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতিতে চলছি। আশপাশের বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য তারা আমাদের জি২০ সভাপতিত্বে একটি অনন্য ভারতীয় পদ্ধতির প্রতিনিধিত্ব করছি।

দিগন্ত বিস্তৃতকরণ

ভারতের সভাপতিত্বে জি২০-তে অংশগ্রহণ শুধু জি২০ সদস্য বা আমন্ত্রিত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আলোচনার ভিত্তিকে সমৃদ্ধ ও বিস্তৃত করতে অন্যান্য দেশ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকেও নির্দিষ্ট জি২০ বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

দেশীয় ও বৈশ্বিক সমন্বয়

জি২০ সভাপতিত্বের অধীনে অনুসৃত ভারতের অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি উন্নয়ন ও অগ্রগতির লক্ষ্যে তার বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ পদ্ধতির একটি সম্প্রসারণ। এটি সমাজের সব অংশকে, বিশেষ করে দুর্বল অংশগুলোকে যুক্ত করার ওপর দৃষ্টি দেয়। উদাহরণ হিসেবে ‘ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের’ কথা বিবেচনা করুন। এটি দেশের সব অংশে সরাসরি নাগরিকদের কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দিতে সরকারকে সক্ষম করেছে স্বচ্ছ, মসৃণ ও দুর্নীতিমুক্ত উপায়ে এই লক্ষ্যটি অর্জন করেছে।

বৈশ্বিক জনগণের পণ্য

অন্তর্ভুক্তির প্রতিবন্ধকতাটি মোকাবেলা করার মধ্যে রয়েছে যে একটি দেশের প্রত্যেক নাগরিককে জীবনের মৌলিক প্রয়োজনীয়তাগুলো সরবরাহ করা এবং তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা সহায়তা নিশ্চিত করা, যে দিকটিতে ভারত ধারাবাহিকভাবে বিশাল অগ্রগতি করছে। বিশ্বব্যাপী জনকল্যাণের জন্য কাজ করা ভারতের বিদেশ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল, যা কভিড-১৯ অতিমারির সময়ও স্পষ্ট ছিল। ভারত বিশ্বের ১৯০টিরও বেশি দেশে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের মতো ওষুধ সরবরাহ করেছে এবং ‘ভ্যাকসিন মৈত্রী’ কর্মসূচির মাধ্যমে ১৫০টিরও বেশি দেশে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ (ভারতে তৈরি) টিকাগুলো বিতরণ করেছে।

গত প্রায় এক দশকে ভারতের উন্নয়ন সহায়তার পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে এবং লাইন অব ক্রেডিটের পরিমাণ ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে সম্প্রসারিত হয়েছে। অধিকন্তু, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যে, ভারত, তার কিছু অংশীদারদের সঙ্গে, মানবিক পদক্ষেপ ও দুর্যোগ ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম সাড়া দেওয়া দেশ হিসেবে কাজ করেছে।

প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছেন, ভারত তার সহযাত্রী উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের উন্নয়ন যাত্রায় যেকোনো উপায়ে সাহায্য করতে প্রস্তুত ও ইচ্ছুক। আমাদের ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানোর এবং আমাদের জনগণকে ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে, আমাদের অভিজ্ঞতা, জানার উপায় এবং সর্বোত্তম অনুশীলনগুলো বিশ্বের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পেরে ভারত আনন্দিত।

লেখক: ভারতের জি২০ সভাপতিত্বের প্রধান সমন্বয়কারী, সাবেক পররাষ্ট্রসচিব এবং বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার।  

বাংলাদেশ সময়: ১০৫৮ ঘণ্টা, আগস্ট ১৬, ২০২৩
এসআইএস
 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।