ঢাকা, বুধবার, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২৯ মে ২০২৪, ২০ জিলকদ ১৪৪৫

মুক্তমত

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ

রফিক সুলায়মান, অতিথি লেখক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৬২৭ ঘণ্টা, আগস্ট ৩১, ২০২৩
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ বঙ্গবন্ধু

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর পরবর্তী সরকারগুলো এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার তো করেইনি বরং বিচার বন্ধে সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল। সে কারণে বিচারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত।

 

একটি দেশের সরকারপ্রধানকে হত্যার বিচার করতে হলে মামলার অত্যাবশ্যকীয় তথ্য-উপাত্তের দরকার হয়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সেই কাজটি করেছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল কাহার আকন্দের নেতৃত্বাধীন একটি টিম। তদন্ত টিমটি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ছাড়াও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে মামলার প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে চার্জশিট দেয়। ২১ বছর রাজপথের রাজনীতি করে ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করলে জুন সরকার গঠন করার পরই বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারের পথ সুগম হয়।

৩১ আগস্ট ১৯৯৬ এ ঘটলো এক অভাবনীয় ঘটনা। রাজশাহী আইন কলেজের ছাত্র তাঈদ উদ্দিন খান এবং তাঁর বন্ধু মোহসিনুল হক ধানমণ্ডি থানায় বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার এবং শাস্তির আওতায় আনার অনুরোধ জানিয়ে একটি মামলা দায়েরের উদ্দেশ্যে এজাহার করেন। ধানমণ্ডি থানা এজাহারটি গ্রহণ করলেও তেমন অগ্রগতি চোখে পড়েনি। সে সময়ের সব পত্রিকা এমন কি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায়ে এই ঘটনা যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়।  

সেদিন তরুণরা ধানমণ্ডি থানায় যে অভিযোগপত্রটি দায়ের করেছিলেন সেটি কেবল সাদামাটা একটি অভিযোগপত্র ছিল না। বাংলাদেশের সংবিধানের নানান অনুচ্ছেদের চুম্বক অংশ তুলে ধরে তাঁরা প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন যে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এর হত্যাকাণ্ডটি ছিল গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। সংবিধানের ৪৭। (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে তাহা সত্ত্বেও গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোনো সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য কিংবা যুদ্ধবন্দিকে আটক, ফৌজদারিতে সোপর্দ কিংবা দণ্ডদান করিবার বিধান সংবলিত কোনো আইন বা আইনের বিধান এই সংবিধানের কোনো বিধানের সহিত অসমঞ্জস বা তাহার পরিপন্থী, এই কারণে বাতিল বা বেআইনি বলিয়া গণ্য হইবে না কিংবা কখনো বাতিল বা বেআইনি হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে না।  

সংবিধানের এরকম অনেক উদ্ধৃতি ব্যবহার করে লেখা হয়েছিল অভিযোগপত্রটি। অভিযোগপত্রে কয়েক জন সেনা কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়। তাঁরা হলেন মেজর দেওয়ান এশায়েতউল্লাহ সৈয়দ ফারুক রহমান পিতা অজ্ঞাত, মেজর খন্দকার আবদুর রশিদ পিতা অজ্ঞাত, মেজর (অব) শরিফুল হক ডালিম পিতা অজ্ঞাত, মেজর আজিজ পাশা পিতা অজ্ঞাত, মেজর শাহরিয়ার পিতা অজ্ঞাত, মেজর বজলুল হুদা পিতা অজ্ঞাত, মেজর রশিদ চৌধুরী পিতা অজ্ঞাত, মেজর মহিউদ্দিন পিতা অজ্ঞাত, মেজর নূর পিতা অজ্ঞাত, মেজর শরিফুল হুসাইন পিতা অজ্ঞাত , ক্যাপ্টেন কিসমত হোসেন পিতা অজ্ঞাত, লে খায়রুজ্জামান পিতা অজ্ঞাত এবং লে আবদুল মজিদ পিতা অজ্ঞাত। এদের মধ্যে আজিজ পাশা জিম্বাবুয়েতে মারা গিয়েছেন বলে জানা গেছে।

বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়ির বিশেষ কর্মকর্তা এবং পিএ আ ফ ম মহিতুল ইসলামের দায়ের করা মামলার অন্তত এক মাস আগে এই অভিযোগটি দায়ের করা হয়েছিলো। পরবর্তী সময়ে মহিতুল ইসলামের মামলাটির রেশ ধরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হয়। এখন পর্যন্ত ছয় জন অভিযুক্তের ফাঁসি কার্যকর হয়, বাকি ছয় জন আসামি পলাতক।

কেন সেদিন অভিযোগ পত্রটি দায়ের করেছিলেন এর জবাবে তাঈদ উদ্দিন খান বলেন, সাংবিধানিকভাবে বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতির পিতা। তাই জাতির পিতার সন্তান হিসেবে হৃদয়ের তাগিদ থেকে আমরা অভিযোগ পত্রটি দায়ের করেছিলাম। তিনি আরো বলেন, আমরা যে কাজ করেছিলাম এ দেশের প্রতিটি নাগরিকেরই এই দায়িত্ব পালন করা উচিত ছিল।

তিনি মনে করেন, পলাতক সকল আসামিকে দেশে ফিরিয়ে এনে এই রায় শতভাগ কার্যকর করতে হবে। মানবাধিকারের দোহাই তোলা যেসব দেশ বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের আশ্রয় দিয়েছে; তাদের কাছে বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমার অনুরোধ তারা যেন খুনিদের বাংলাদেশের আইন ও বিচার বিভাগের কাছে ফিরিয়ে দেয়। অভিযুক্ত সকল খুনির শাস্তি কার্যকর করতে পারলেই বাংলাদেশ অভিশাপ মুক্ত হবে।

শোকাবহ আগস্টে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগকারী তাঈদ উদ্দিন খান এবং মোহসিনুল হকের অনন্য উদ্যোগের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।  

লেখক: সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী 

বাংলাদেশ সময়: ১৬২৫ ঘণ্টা, আগস্ট ৩১, ২০২৩
এসআইএস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।