ঢাকা, সোমবার, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ শাবান ১৪৪৫

মুক্তমত

দ. এশিয়ায় নদীর তলদেশে প্রথম টানেল এখন বাস্তব, জয়তু শেখ হাসিনা

তপন চক্রবর্তী, ডেপুটি এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২২০২ ঘণ্টা, অক্টোবর ২৬, ২০২৩
দ. এশিয়ায় নদীর তলদেশে প্রথম টানেল এখন বাস্তব, জয়তু শেখ হাসিনা তপন চক্রবর্তী

বন্দরনগর চট্টগ্রামে ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংকে নিয়ে যখন কর্ণফুলী নদীর তলদেশে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম টানেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, তখনো এতদঞ্চলের মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেনি। ভাবেনি, মাত্র কয়েক মিনিটে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে আনোয়ারা যাওয়া সম্ভব হবে।

২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রথম টানেল টিউব নির্মাণকাজ উদ্বোধন করার পর সেই স্বপ্ন ডানা মেলতে থাকে।

অপেক্ষার পালা শেষ হয়েছে। স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। আগামী ২৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া আরও ১৯টি প্রকল্প উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন তিনি।

বর্তমান সরকার বন্দরনগরকে চীনের সাংহাই নগরের মতো ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ মডেলে পরিণত করতে পতেঙ্গা ও আনোয়ারা উপজেলাকে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে এই টানেল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। টানেলটি প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়েকে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করছে এবং চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব কমিয়ে দিচ্ছে ৪০ কিলোমিটার। এই টানেল দিয়ে যানবাহন চলবে ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে।

নগরের পতেঙ্গা নেভাল অ্যাকাডেমির পাশ ঘেঁষে শুরু হয়ে কর্ণফুলী নদীর মাঝ দিয়ে দক্ষিণ পাড়ের আনোয়ারা প্রান্তে উঠেছে এ টানেল। আনোয়ারার চাতরি বাজার থেকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর যেতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। বঙ্গবন্ধু টানেল দিয়ে আনোয়ারা থেকে মাত্র ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর যাওয়া সম্ভব হবে। আনোয়ারা হয়ে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়াসহ পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামে সহজ হবে যাতায়াত। চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড দিয়ে বঙ্গবন্ধু টানেলের ভেতর হয়ে পিএবি সড়ক ঘুরে যানবাহন উঠবে কক্সবাজার মহাসড়কে।

এই টানেল ঘিরে শিল্প জোন আনোয়ারা পরিণত হচ্ছে উপশহরে। এখানে রয়েছে পারকি সমুদ্র সৈকত, সার কারখানা- সিইউএফএল, কাফকো, ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি এবং কোরিয়ান ইপিজেড ও চায়না ইকোনমিক জোন। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ১৯৯৫ সালের মাস্টারপ্ল্যানে আনোয়ারাকে ‘গ্রোথ সেন্টার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে এই উপজেলায় শুরু হয়েছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ। পাল্টে যাচ্ছে গ্রামীণ জনপদের চিত্র। টানেল সড়ক ধরে কক্সবাজার পর্যন্ত হয়েছে উন্নত সড়ক যোগাযোগ ও রেলসংযোগ। সড়কের দুইপাশে গড়ে উঠছে শিল্পকারখানা এবং আবাসন। ১৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে জি টু জি পদ্ধতিতে গহিরা এলাকায় ৭৭৪ একর জমিতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। সেখানে স্থাপন করা হবে ৩৭১টি শিল্প কারখানা। পারকি সৈকতের পাশে পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে ১৩ দশমিক ৩৬ একর জমিতে ৭১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে বিশ্বমানের অত্যাধুনিক পর্যটন কমপ্লেক্স।  

টানেলের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার। এটি নদীর তলদেশের ১৮ থেকে ৩১ মিটার গভীরে। পাড়ি দিতে সময় লাগবে ৩ থেকে সাড়ে ৩ মিনিট। টানেল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। নগরের পতেঙ্গা ও আনোয়ারা উপজেলা প্রান্তে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সংযোগ সড়ক রয়েছে। টানেলের ভেতরে গাড়ির সর্বোচ্চ গতি হবে ৮০ কিলোমিটার। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে চীনের চায়না কমিউনিকেশনস ও কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসিএল) লিমিটেড। তারা রক্ষণাবেক্ষণ ও টোল আদায়ের কাজও করবে।  

চট্টগ্রাম সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও ১৯টি প্রকল্প উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। উদ্বোধনের তালিকায় আছে- চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স, জেলা পরিষদ টাওয়ার, রাঙ্গুনিয়া ও আনোয়ারা জেলা পরিষদ ডাকবাংলো, শেখ কামাল অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হল, রাউজানে শেখ কামাল কমপ্লেক্স, আগ্রাবাদে সিজিএস কলোনিতে নয়টি বহুতল আবাসিক ভবন, বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ও শিকলবাহা খালের ওপর পিসি গার্ডার ব্রিজ। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন তালিকায় আছে- চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর, বিমানবন্দর থেকে বঙ্গবন্ধু টানেল পর্যন্ত শেখ হাসিনা সড়ক ও সিমেন্স হোস্টেল কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ।

এছাড়াও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের বাস্তবায়ন করা বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মধ্যে রয়েছে- ডিসি পার্ক, হাজার বছরের নৌকা জাদুঘর, ১৯১টি ইউনিয়নে খেলার মাঠ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, স্মার্ট স্কুল বাস সার্ভিস, পর্যটক বাস, রিভার ক্রুজ ও ফুল ডে ট্যুর সম্বলিত পর্যটন সেবা, বার্ডস পার্ক ও চিড়িয়াখানার আধুনিকীকরণ।

২০০৮ সালে লালদীঘির মাঠে নির্বাচনী সমাবেশে চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব নিজ হাতে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তার প্রমাণ রেখেছেন নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠনের পর। তাঁর উদ্যোগে কর্ণফুলী নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং, সদরঘাটে নতুন লাইটার জেটি নির্মাণ হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে নির্মিত হয়েছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল। ২০১৭ সালে জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্পে ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার অনুমোদন দেওয়া হয়।  

পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত আউটার রিং রোড বাস্তবায়নের পাশাপাশি বায়েজিদ বাইপাস সড়ক চালু হয়েছে। লালখান বাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে শহরের ভেতর দিয়ে যান চলাচলে সহায়তা করবে। ৩০ হাজার একর জমিতে ২০১৮ সালে মীরসরাইয়ে শুরু হয় ৩৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর। এই শিল্পনগর হবে আগামীর অর্থনীতির মূল ভিত্তি।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার পশ্চিমে মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গড়ে উঠছে উপমহাদেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর। বঙ্গোপসাগর থেকে উপকূলের দিকে ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ, ৩৫০ মিটার চওড়া ও ১৬ মিটার গভীরতায় ড্রেজিং করে নির্মাণ করা হয়েছে জেটি। ২০২৬ সালে জেটিতে ১৬ মিটার ড্রাফটের বেশি জাহাজ ভেড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ চলছে।  

১৯৮৭ সালের পর থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম ওয়াসা কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর দৈনিক প্রায় ৩৮ কোটি লিটার পানি উত্তোলনের তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকার স্যুয়ারেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। কর্ণফুলী নদীর ওপারে বোয়ালখালীর ভাণ্ডালজুড়িতে আরও একটি প্রকল্প থেকে দৈনিক ছয় কোটি লিটার পানি উৎপাদনে আসবে।  

প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রামের দোহাজারী-কক্সবাজার ১০১ কিলোমিটার নতুন রেললাইন আগামী ১২ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে প্রস্তুত হয়েছে কক্সবাজারের ঝিলংজায় নির্মিত দৃষ্টিনন্দন আইকনিক রেলস্টেশন। ২ নভেম্বর নির্মাণাধীন দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইনে পরীক্ষামূলক ট্রেন চলাচল শুরু হবে।  

সরকারের তিন মেয়াদে নেওয়া প্রায় সব বড় প্রকল্প বাস্তব রূপ পাওয়ায় পাল্টে গেছে বন্দর-নগরের চেহারা। ‘বদলে যাওয়া’ এই নগরে আগামী নির্বাচনের ওয়াদা হিসেবে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ এর রূপরেখা ঘোষণা করবেন শেখ হাসিনা। তাই চট্টগ্রামবাসী অপেক্ষায় আছে, তাঁকে বরণ করে নিতে।

বাংলাদেশ সময়: ২২০০ ঘণ্টা, অক্টোবর ২৬, ২০২৩ 
টিসি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।