ঢাকা, বুধবার, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২৯ মে ২০২৪, ২০ জিলকদ ১৪৪৫

জাতীয়

দুইজন নিহত হওয়ার পর মেরামত হলো রেলক্রসিংয়ের গেট ব্যারিয়ার

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৯৫১ ঘণ্টা, এপ্রিল ২৪, ২০২৪
দুইজন নিহত হওয়ার পর মেরামত হলো রেলক্রসিংয়ের গেট ব্যারিয়ার

ময়মনসিংহ: ‘ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা গেল’ বাংলা প্রবাদের বহুল আলোচিত এই কথাটি আবারও সত্য প্রমাণ হয়েছে ময়মনসিংহ রেলওয়েতে। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাসহ সচেতন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

 

এর আগে মঙ্গলবার (২৩ এপ্রিল) রাতে ময়মনসিংহ নগরীর পচাপুকুর পাড় এলাকার রেলক্রসিংয়ে দেওয়ানগঞ্জগামী ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত হয়। এ ঘটনার একদিন পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হুঁশ ফিরে আসায় বুধবার (২৪ এপ্রিল) সকালে মেরামত করা হয় ওই ক্রসিংয়ের গেট ব্যারিয়ার।  

বুধবার (২৪ এপ্রিল) দুপুরে নগরীর পচাপুকুর পাড় এলাকার রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বরত গেটম্যান মো. আলম বাদশা এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।  

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘গতরাতে দুর্ঘটনার সময় গেট ব্যারিয়ারের একপাশের ব্যারিয়ার নষ্ট ছিল। তবে আজ বুধবার দুপুরে নষ্ট ব্যারিয়ার মেরামত করা হয়েছে। ’ কিন্তু মেরামতের আগেই বিয়ের বাজার করতে এসে ট্রেনের ধাক্কায় নিহত হন ময়মনসিংহ সদর উপজেলার উজান বাড়েরা এলাকার বাসিন্দা মো. আবদুর রহমান (৫৫) ও তার ভাতিজি শেফালি আক্তার (৪০)।  

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঢাকা থেকে দেওয়ানগঞ্জগামী ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ট্রেনটি ময়মনসিংহ জংশন অতিক্রম করে জামালপুরের দিকে যাচ্ছিল। এ সময় জংশনের কাছাকাছি এলাকায় মিন্টু কলেজ ও নতুন বাজার রেলক্রসিংয়ের মাঝে পচাপুকুরপাড় এলাকায় অপর একটি ক্রসিংয়ে ট্রেনটি যাত্রীবাহী একটি অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয়। এতে যাত্রীরা রেললাইনে ছিটকে পড়লে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, ট্রেন আসার সময় ক্রসিংয়ে ব্যারিয়ার না ফেলার কারণে অটোরিকশাটি রেললাইনের ওপরে উঠে যায়। এতেই ঘটে দুর্ঘটনা। তবে দুর্ঘটনার পর তড়িঘড়ি করে ফেলা হয় ব্যারিয়ার।

নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা জানান, যথা সময়ে ক্রসিং ব্যারিয়ার ফেলা হলে আটোরিকশাটি রেললাইনের ওপরে উঠতে পারত না। ঘটতও না এই দুর্ঘটনা।  

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুর্ঘটনার সময় এই ক্রসিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন গেটম্যান মো. মোস্তাফিজুর রহমান। তার উপস্থিতিতেই ঘটেছে দুর্ঘটনা। তবে ঘটনার বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও গেটম্যান মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য জানা যায়নি।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনা কবলিত ক্রসিংয়ে আমাদের গেটম্যান ছিল। তবে ঘটনার সময় একপাশে ব্যারিয়ার পড়লেও আরেক পাশের ব্যারিয়ার পড়েনি। ওই সময় ব্যারিয়ার না পড়া পাশ দিয়ে যাত্রীবাহী অটোরিকশাটি ঢুকে যায়। এ কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে বলে আমরা জানতে পেরেছি। তবে এ ঘটনায় প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ করছে। বিস্তারিত প্রতিবেদনে জানা যাবে।    

সূত্রমতে, গত কয়েক বছর ধরে ময়মনসিংহের ২০৫টি রেলক্রসিং মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। অরক্ষিত এসব ক্রসিংয়ের অনেক স্থানে নেই গেটম্যান ও গেট বেরিয়ার। আবার অনেক স্থানে গেটম্যান থাকলেও গেট বেরিয়ার অকেজো বা ভেঙে পড়া অবস্থা। সেই সঙ্গে এসব রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বে থাকা বেশির ভাগ গেটম্যানের বিরুদ্ধে রয়েছে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ। এমনকি এই কাজে নিয়োগপ্রাপ্ত একজনের স্থলে কাজ করছেন অন্য লোক। ফলে এসব রেলক্রসিংয়ে অতীতের ন্যায় এখন চলছে অহরহ দুর্ঘটনা। এতে প্রাণহানি ঘটছে অসংখ্য মানুষের। তবুও প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে এসব ক্রসিং পার হচ্ছে শত শত মানুষ ও যানবাহন।    

রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ-ঢাকা, ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা-মোহনগঞ্জ, ময়মনসিংহ-জামালপুর রুটের বিদ্যাগঞ্জ ও ময়মনসিংহ-ভৈরব রেলপথের মোট ২০২ কিলোমিটার ময়মনসিংহ রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। এসব রুটে রেলের মোট লেভেল ক্রসিং সংখ্যা ২০৫টি। এর মধ্যে অনুমোদিত লেভেল ক্রসিং মাত্র ৬৫টি। এতে গেটম্যান ও গেট ব্যারিয়ার  আছে মাত্র ৪৮টিতে। এর বাইরে অননুমোদিত ক্রসিং ১৪০টি। ফলে অনুমোদিত এবং অননুমোদিত ১৫৭ টিতে ক্রসিংয়ে নেই গেটম্যান ও বেরিয়ার।

তারা জানান, অননুমোদিত লেবেল ক্রসিংগুলো এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ এবং স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের প্রয়োজনে তৈরি করেছে।  

সূত্র জানায়, কোনো রেললাইন স্থাপনের ১০ বছরের মধ্যে কোথাও কোনো লেবেল ক্রসিং নির্মাণের দরকার হলে তা রেলের নিজস্ব অর্থায়নে করে দেওয়া হয়। এ সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর সরকারের অন্য কোনো বিভাগের সড়ক নির্মাণের কারণে লেবেল ক্রসিংয়ের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিজ খরচে তা নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু রেল লাইনের ওপর দিয়ে সরকারের অন্য বিভিন্ন বিভাগ থেকে রাস্তা করা হলেও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি তাদের তরফ থেকে করে দেওয়া হয়নি কোনো ওয়ার্নিং বোর্ডও।    

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আকরাম আলী বলেন, এই মুহূর্তে ময়মনসিংহে মোট রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা বলা যাচ্ছে না। তবে আনুমানিক এর সংখ্যা দুই শতাধিক। এর মধ্যে বড় ক্রসিংগুলোতে ছয়জন করে এবং ছোটগুলোতে তিনজন করে গেটম্যান থাকার নিয়ম। তবে নানান কারণে অনেক স্থানে গেটম্যান কম রয়েছে। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ সময়: ১৯৪৯ ঘণ্টা, এপ্রিল ২৪, ২০২৪
আরএ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।