ঢাকা, বুধবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২২ মে ২০২৪, ১৩ জিলকদ ১৪৪৫

জাতীয়

নিরাপত্তাহীন নোমান-রাকিবের পরিবার 

এখনও অধরা জেহাদি, এলাকায় সংঘবদ্ধ অন্য আসামিরা

মো. নিজাম উদ্দিন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৯২৩ ঘণ্টা, এপ্রিল ২৫, ২০২৪
এখনও অধরা জেহাদি, এলাকায় সংঘবদ্ধ অন্য আসামিরা ওপরে ডানে ইনসেটে আবুল কাশেম জেহাদি। নিচের ডানে নিহত রাকিব ইমাম ও আবদুল্লাহ আল-নোমান।

লক্ষ্মীপুর: লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বশিকপুরে গত এক বছর আগে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন যুবলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল-নোমান এবং ছাত্রলীগ নেতা রাকিব ইমাম। জোড়া এ হত্যাকাণ্ডটি দেশব্যাপী আলোচিত একটি ঘটনা ছিল।

 

হত্যাকাণ্ডের পেছনে দায়ী করা হয়েছে জেলার শীর্ষ একটি সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান আবুল কাশেম জেহাদিকে। তাকে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। তবে ঘটনার এক বছর পার হয়ে গেলেও পুরোপুরি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে প্রধান অভিযুক্ত জেহাদি।

ঘটনার পর পরই তার বাহিনীর কয়েকজন সদস্য গ্রেপ্তার হলেও এখন তারা জামিনে বাইরে আছেন।  

চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি সে সময় সর্বোচ্চ আলোচনার জন্ম নিলেও কয়েক মাসের মাথায় আলোচনা অনেকটা চাপা পড়ে যায়। মূল অভিযুক্ত গ্রেপ্তার না হওয়ায় অসন্তোষ নিহতের পরিবারের সদস্যদের। আর মামলার বাদী নিহত যুবলীগ নেতা নোমানের বড়ভাই স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমানও রয়েছেন নিরাপত্তা হীনতায়।  

নিহত আবদুল্লাহ আল নোমান বশিকপুর ইউনিয়নের উষিয়াকান্দি গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে। তিনি জেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাকে ওই সময় জেলা আওয়ামী লীগের নবগঠিত কমিটির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক রাখা হয়। তিনি দুই ছেলে সন্তানের জনক ছিলেন।  

আর রাকিব ইমাম ছিলেন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি একই ইউনিয়নের নন্দীগ্রামের রফিকউল্যার ছেলে।  

গত বছরের ৫ এপ্রিল ওমরাহ পালনের উদ্দেশে সৌদি আরবে যান যুবলীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল নোমান। ২০ এপ্রিল দেশে ফিরে দুদিন ঢাকার বাসায় থেকে ঈদের দিন (২২ এপ্রিল) গ্রামের বাড়িতে আসেন নোমান। গ্রামে আসার পরই সন্ত্রাসীরা তাকে টার্গেট করে। তিনদিনের মাথায় অনেকটা প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা হয় তাকে। তার সঙ্গে থাকা ছাত্রলীগ নেতা রাকিব ইমামকেও হত্যা করা হয়।  

যা ঘটেছিল সেদিন
ঘটনার দিন ছিল ২০২৩ সালের ২৫ এপ্রিল রাত। এলাকায় ছিল ঈদুল ফিতরের আমেজ। ওইদিন রাতে দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে পোদ্দারবাজারে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করে নোমান। তাদের বিদায় দিয়ে নোমান ছাত্রলীগ নেতা রাকিবকে সঙ্গে করে রাত ৯টার দিকে মোটরসাইকেল যোগে পোদ্দার বাজারের ব্রিজ থেকে খালপাড় হয়ে উত্তর দিকে নাগেরহাটের দিকে যাচ্ছিলেন। মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন রাকিব, পেছনে ছিলেন নোমান। কিছুদূর না যেতেই একটি করাত কলের পাশেই তাদের ওপর হামলা চালায় একদল দুর্বৃত্ত। তাদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। সেসময় তাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও নোমানের মোবাইলফোনও নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা।  

নোমান সড়কের পাশে থাকা খালে পড়ে যান। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের ভয়ে প্রথমে কেউ তাদের উদ্ধার করার সাহস পায়নি। পরে স্থানীয়রা তাদের দুজনকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় ভাই ভাই হাসপাতালে নিয়ে যান। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের নিয়ে আসা হয় জেলা সদর হাসপাতালে। সেখানেই কর্তব্যরত চিকিৎসক যুবলীগ নেতা নোমানকে মৃত ঘোষণা করে। আর ঢাকায় নেওয়ার পথেই রাকিবের মৃত্যু হয়।  

কে ছিলেন আবুল কাশেম জেহাদি? 
আবুল কাশেম ওরফে কাশেম জেহাদি। তিনি ছিলেন বশিকপুর ইউনিয়নের দুবারে সাবেক চেয়ারম্যান। ছিলেন চন্দ্রগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির দায়িত্বে। নোমান-রাবিক হত্যাকাণ্ডের পর তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। জেহাদি আওয়ামী লীগে যোগ দেন ১৯৯৬ সালের দিকে। এর আগে তিনি জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তখন প্রতিপক্ষের লোকজনের ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে তিনি ‘জেহাদি’ উপাধি পান। তখন থেকে কথায় কথায় গুলি, হামলা, মারধর, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে সম্পৃক্ত হন তিনি। তার বিরুদ্ধে এলাকায় চাঁদাবাজি, হত্যা, মারামারির বেশ কিছু মামলা ছিল। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে বিভিন্ন সময়ে তিনি সেগুলো থেকে রেহাই পান।  

জেহাদির একটি অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে। এ বাহিনীর সদস্যরা চাঁদাবাজি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, হত্যা সহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।  

র‍্যাবের দেওয়া তথ্যমতে, তার বাহিনীতে অন্তত ৩০০ জনের মতো সদস্য রয়েছে। জোড়া খুনের ওই বাহিনী সদস্যরা কয়েকদিনের জন্য গা-ডাকা দিলেও এখন আবার সক্রিয়।

জেহাদি ২০১৩ সালে দত্তপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান নুর হোসেন শামীম হত্যা মামলা, ২০০০ সালে লক্ষ্মীপুরের আইনজীবী নুরুল ইসলাম, দত্তপাড়া এলাকার আবু তাহের, বশিকপুরের নন্দীগ্রামের মোরশেদ আলম, করপাড়ার মনির হোসেন, উত্তর জয়পুরের সেলিম ভূঁইয়া ও কামাল হোসেন হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন খুনের মামলার আসামি। ঘটনার পর র‍্যাবের প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে আসে।  

নোমান-রাকিব হত্যার অভিযোগ কেন তার বিরুদ্ধে?
২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর বশিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তখন নৌকা প্রতীকে চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলেন আবুল কাশেম জেহাদি। আর যুবলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল নোমানের ভাই মাহফুজুর রহমানও প্রার্থী হন। নির্বাচনে নৌকার পরাজয় হয়ে মাহফুজুর রহমান বিজয়ী হন। নির্বাচিত হয়ে মাহফুজুর রহমান ছোটভাই নোমানের সহায়তায় এলাকায় জিহাদি ও তার বাহিনীর চাঁদাবাজি এবং মাটি দস্যুতা বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। একদিকে নির্বাচনে পরাজয়, অন্যদিকে এলাকায় প্রভাব বিস্তার সংকটে পড়ে জেহাদি বাহিনী। এ দুই ইস্যুতে টার্গেটে পড়েন যুবলীগ নেতা নোমান। ফলে জেহাদির নির্দেশে নোমানকে হত্যা করা হয়। আর তার সঙ্গে থাকায় রাকিবও হত্যার শিকার হন।  

ঘটনার পরপরই পুলিশ ও র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জবানবন্দিতে এমন তথ্য উঠে আসে। আর হত্যাকাণ্ডের পর নোমানের ভাই মাহফুজুর রহমান জেহাদি ও তার বাহিনীকে দায়ি করেন।  

অধরা থেকে যায় জেহাদি, অন্য আসামিরা জামিনে
ঘটনার পরদিন নোমানের ভাই ইউপি চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান বাদী হয়ে চন্দ্রগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এতে আবুল কাশেম জেহাদিকে প্রধান আসামি করে ১৮ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ১৪-১৫ জনকে বিবাদী করা হয়। বিভিন্ন সময়ে পুলিশ এবং র‍্যাবের হাতে মামলার এজাহারভুক্ত ১১ জন আসামি ও সন্দেহভাজন আরও ১১ জন আসামি গ্রেপ্তার হয়। প্রধান আসামি আবুল কাশেম জেহাদিসহ এজাহারভুক্ত অন্য তিন আসামি আজও অধরা রয়ে গেছে। জেহাদি কোথায় আছে, সে বিষয়টি নিশ্চিত নয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঘটনার পরপরই পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যায় জেহাদি। তবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয়ভাবে তাকে নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম হলে অজ্ঞাত স্থান থেকে ওয়ার্টঅ্যাপে ভয়েস মেসেজ পাঠাতেন তিনি। তার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের শাসানো এবং কারও কারও কাছ মোটা অঙ্কের চাঁদাও দাবি করেছে জেহাদি। কেউ কেউ বলছে- ঘটনার পর সুযোগ বুঝে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে দেশ ত্যাগ করেন তিনি। তবে ‘আবুল কাশেম জিহাদি সমর্থক’ নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে নিজের সক্রিয়তা জানান দেয় জেহাদি।  

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, মামলার পর থেকে এজহারনামীয় ১১ জন, তদন্তে প্রাপ্ত ও সন্দেহজনক ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা জামিনে রয়েছেন। এর মধ্যে তিনজন উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান।  

তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, মামলার প্রধান আসামি কাশেম জিহাদিসহ এজাহারনামীয় চারজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। কাশেম জিহাদির অবস্থানও জানা যাচ্ছে না। কিছুদিন ভয়েস পাঠিয়ে বিভিন্নজনকে হুমকি ধমকি দিলেও এখন তা হচ্ছে না। মামলার তদন্ত এখনও চলমান। ঘটনার বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। আরও অনেক তথ্য পাওয়া বাকি আছে। তথ্য উদঘাটন শেষ হলে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করা হবে।  

আসামিদের জবানবন্দি
হত্যার দায় স্বীকার করে আসামি দেওয়ান ফয়সাল ও আলমগীর হোসন ওরফে কদু আলমগীর আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। ঘটনার পর ০১ মে ঠাকুরগাঁও জেলা থেকে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা দেওয়ান ফয়সালকে র‌্যাব-১১ আটক করে পরদিন পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে এবং আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি নিজের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা স্বীকার করে স্বেচ্ছায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডের আগের দিন নোমান এলাকায় একজনকে মারধর করেন। তার প্রতিশোধ হিসেবে নোমানকে তারা মারধর করার পরিকল্পনা করেন। ফোন কল পেয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে নাগেরহাট এলাকায় যান তিনি। সেখানে মোটরসাইকেল রেখে হেঁটে ঘটনাস্থল করাতকলের পাশে গিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন ফয়সালসহ অন্যরা। এর মধ্যে রাকিব ওই পথ দিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে নোমানকে নিয়ে যাওয়ার সময় রাকিবকে লক্ষ্য করে শর্টগান দিয়ে গুলি করেন হত্যাকারীরা। এতে রাকিব পড়ে যান। নোমান লাফ দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে একটি দোকানে ঢুকলে সেখানে তার ওপর হামলা চালানো হয়। এরপর আরেকটি দোকানে ঢুকলে সেখান থেকে বের করে এনে তিনজনের (হত্যাকারী) মধ্যে একজন নোমানের মাথায় গুলি করেন। এরপর হত্যাকারীরা হেঁটে গিয়ে অটোরিকশায় ওঠেন। দেওয়ান ফয়সাল ওই এলাকার একটি কাঁচা রাস্তা হয়ে রামগঞ্জ এলাকায় চলে যান।  

দেওয়ান ফয়সাল এখন জামিনে আছেন। এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।  

প্রাণ নিয়ে শঙ্কিত মামলার বাদীসহ নিহতদের পরিবার
মামলার বাদী মাহফুজুর রহমান প্রতিনিয়ত তার প্রাণ নিয়ে শঙ্কায় আছে। থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেন তিনি।  

মাহফুজুরের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামিরা জামিনে বের হয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দলীয় আইনজীবীরা অপরাধীদের জামিনে বের করতে উঠেপড়ে লেগেছিল। তাদের হাত ধরেই অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। জেহাদিও আটক হয়নি। প্রথম থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হত্যাকারীদের আটক করতে যেভাবে তৎপর ছিল, সেটা কমে গেছে। জেহাদির নির্দেশ ও দিকনির্দেশনায় জামিনে আসা আসামিরা এখন সংঘবদ্ধ। জেহাদি অজ্ঞাত স্থানে ভয়েজ ম্যাসেজ পাঠিয়ে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে এখনও চাঁদা দাবি করছেন। রাকিবের ভাইকে রুবেলকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। তিনিও (মাহফুজুর) জীবনের নিরাপত্তা হীনতায় আছি।  

তিনি বলেন, সব আসামিরা এখন জামিনে মুক্ত। প্রধান আসামিও বাইরে। হত্যাকারী শরীফ, মকবুল, কালুও গ্রেপ্তার হননি। জামিনে বের হওয়া আসামিরা এখন সংঘবদ্ধ। জেহাদি গ্রামের বাড়ি রশিদপুরে জড়িবাড়ী এলাকায় বাহিনীর সদস্যরা একত্রিত হচ্ছে। জিহাদির ভাই লেদা ও আসামি নিশানের নেতৃত্বে বাকিরা এলাকায় অস্ত্র নিয়ে ঘোরাঘুরি করছেন। তাদের ভয়ে আমি বাড়ি থেকে বের হতে পারি না। বাড়ির সামনে মসজিদ, সেখানে নামাজ পড়তে আসতেও মনের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করে।  

একই কথা জানিয়ে রাকিব ইমামের ভাই রুবেল বলেন, আমি বাড়িতে থাকি না। প্রথম প্রথম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ছিল। কয়েকজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছিল। তখন নির্ভিঘ্নে বাড়ি আসা যাওয়া করতে পারতাম। কিন্তু এখন আসামিরা জামিনে মুক্ত। এলাকায় তাদের পদচারণা আছে। এলাকায় এখন অশান্ত পরিবেশ। আমাকে জেহাদি ও তার সন্ত্রাসীরা বেশ কয়েকবার মোবাইলফোনে হুমকি দিয়েছে। আমি চারবার জিডি করেছি।  

এ সময় প্রধান আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন রুবেল।  

অস্ত্র উদ্ধার হয়নি
বশিকপুরকে অবৈধ অস্ত্রের ভাণ্ডার বলা হতো। বিভিন্ন সময়ে সেখানে খুন-খারাপি লেগেই ছিল। নোমান-রাকিব হত্যার কয়েক মাস আগে খুন হয় জেহাদির দেহরক্ষী আলাউদ্দিন। তিনি নিজেও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ছিল। অবৈধ অস্ত্র নিয়ে এলাকার মানুষ ছিল আতঙ্কিত। বিভিন্ন সময়ে বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্রের মহড়া দিত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও এসব অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। যদিও জোড়া খুনের পর পুলিশ আসামি মশিউর রহমান নিশান ও বাবলুর দেওয়া তথ্যমতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি অস্ত্র ও পাঁচ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করে।  

জবানবন্দিতে আসামি কদু আলমগীরও বলেছে, তার হাতে পিস্তল ছিল, একজনের হাতে বন্দুক ছিল। ঘটনার পর অস্ত্র উদ্ধারে তেমন কোনো সাফল্য ছিল না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। সেই অস্ত্রগুলো অক্ষত থাকায় নিহতদের পরিবারসহ এলাকায় লোকজন এখনও আতঙ্কিত।  

আন্দোলনে ভাটা
শুরুতে হত্যা মামলার বিচার ও জেহাদির ফাঁসির দাবি নিয়ে সবর ছিল এলাকার লোকজন। দলের নেতা-কর্মীরাও জেহাদির গ্রেপ্তারের দাবি তুলে ছিল। কিন্তু মাস না পেরোতেই সেই আন্দোলনে ভাটা পড়েছে।  

এর কারণ হিসেবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধান আসামি জেহাদি গ্রেপ্তার না হলেও এলাকায় তার প্রভাব রয়েই গেছে। তার বাহিনীর যেসব সদস্য রয়েছে, শুরুতে তারা প্রকাশ্যে না থাকলেও এখন এলাকায় সংঘবদ্ধ হয়ে আছেন। আর ঘটনার পর জেহাদি বিভিন্ন লোকজনকে মোবাইলফোনে ভয়েজ পাঠিয়ে হুমকি দিত। এসব কারণে হত্যার বিচার নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে যে আন্দোলন ছিল, তা পুরোপুরি চাপা পড়ে যায়।  

বাদী মাহফুজুর রহমান বলেন, সবারই জীবনের ভয় আছে। জেহাদির হাতে প্রাণ হারানোর ভয়ে এখন সবাই চুপ হয়ে আছে।  

আসামিদের সাজা নিয়ে সংশয় খোদ সংসদ সদস্যের
সম্প্রতি প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয় চন্দ্রগঞ্জের ছাত্রলীগ নেতা এম সজীব। তার জানাজায় অংশ নিয়ে লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকু বলেন, নোমান-রাকিব হত্যা মামলাটি যে অবস্থায় আছে, তাতে হত্যাকারীদের সাজা হবে বলে কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আমি প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। ওই মামলা যে অবস্থাতে আছে তাতে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এমপির এমন শঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (পরিদর্শক) নিজাম উদ্দিম ভূঁইয়া বলেন, এমপি কীভাবে কি বলেছেন, তা তার ব্যক্তিগত কথা। আমাদের পক্ষ থেকে তাকে কিছুই জানানো হয়নি।

কেমন আছে নোমান-রাকিবের তিন সন্তান
যুবলীগ নেতা নোমানের দুই ছেলে। আর ছাত্রলীগ নেতা রাকিবের এক মেয়ে। নোমান যখন খুন হন। তখন তার বড় ছেলে নুহাদের বয়স প্রায় ৬ বছর, আর ছোট ছেলে নুরাজের বয়স প্রায় ৬ মাস। রাকিবের রুহি নামে এক মেয়ে আছে। ঘটনার সময় তার বয়স ছিল প্রায় ৮ মাস। এরা দুজন যখন খুন হয়, তখনও তাদের সন্তানদের বোঝার বয়স হয়নি। তবে নোমানের বড় ছেলে নুহাদ বাবার কবরে এসে কান্নাকাটি করতো।

নোমানের ভাই মাহফুজুর রহমান জানান, তার ভাইয়ের স্ত্রী ও সন্তানরা এখন ঢাকাতেই বসবাস করছেন। ঈদের সময় তারা বাড়িতে এসেছিলেন। বাড়িতে এসে ছোট দুটি ছেলে তাদের বাবাদের খুঁজে বেড়ায়।  

রাকিবের ভাই রুবেল জানান, ঘটনার সময় তার ভাইয়ের মেয়েটি খুব ছোট ছিল। বাবার ছবি দেখে ‘বাবা বাবা’ বলে ডাকে।  

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ
হত্যা মামলার আসামি গ্রেপ্তার না হওয়া এবং অগ্রগতি না থাকায় গত ২১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নিহত নোমানের ভাই মাহফুজুর রহমান, রাকিবের বাবা রফিক উল্যা ও ভাই সাইফুল ইসলাম রুবেল। এসময় তারা মামলার অগ্রগতি না হওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানান। প্রধানমন্ত্রী তাদের আশ্বস্ত করেছেন বলে জানায় নিহতদের পরিবারের সদস্যরা।

যা বললেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকতা
হত্যা মামলার অগ্রগতি এবং বশিকপুরের আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক বাংলানিউজকে বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ অনেক কাজ করেছে। শুরুতে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষসহ সিনিয়র অফিসাররা মাঠে ছিলাম। এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলা তদন্তাধীন আছে। চেষ্টা করছি মামলাটি সুষ্ঠু তদন্ত করে দ্রুত যেন চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া যায়। এ মামলা প্রশ্নবিদ্ধ হবে, এমন কোনো তদন্ত এ মামলায় হবে না। তদন্তকারী কর্মকর্তা একেবারে আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করে যাচ্ছেন।  

তিনি বলেন, বশিকপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। যে পুলিশ ক্যাম্প আছে, সেখানে পর্যাপ্ত অফিসার ও ফোর্স রাখা আছে। ওইসব এলাকায় আমাদের পর্যাপ্ত নজরদারি আছে।  

বাংলাদেশ সময়: ১৯২০ ঘণ্টা, এপ্রিল ২৫, ২০২৪
এসআরএস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।