ঢাকা, বুধবার, ১০ বৈশাখ ১৪৩১, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১৪ শাওয়াল ১৪৪৫

জাতীয়

আজীবন মানুষের সেবা করা মোমিন চৌধুরী নিজের চিকিৎসায় অসহায়

ইফফাত শরীফ, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩০৪ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৪
আজীবন মানুষের সেবা করা মোমিন চৌধুরী নিজের চিকিৎসায় অসহায় মোমিন আহমেদ চৌধুরী

ঢাকা: ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকায় ছিলেন জয়পুরহাটের মোমিন আহমেদ চৌধুরী। তিনি একজন আইনজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

মানুষটি সব সময় বিপদে আপদে মানুষের পাশে থাকতেন। অথচ আজ নিজের চিকিৎসা করাতে এসে অসহায় অবস্থায় পড়েছেন তিনি। পরোপকারী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই মানুষটি কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। মোমিন আহমেদের শারীরিক অবস্থা দিন দিন অবনতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

সোমবার ইউনাইটেড হসপিটালে কথা হয় মোমিন আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি চিকিৎসার মাধ্যমে বাঁচার সুযোগ চান।

বর্তমানে ঢাকার ইউনাইটেড হসপিটালে ইউরোলজি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. এম এ জুলকিফলের অধীনে ৪২৩ নম্বর কেবিনে ভর্তি রয়েছেন মোমিন আহমেদ চৌধুরী।  

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত মোমিন আহমেদের শারীরিক অবস্থা দিন দিন অবনতি হচ্ছে। মূত্র থলিতে টিউমার ধরা পড়েছে। এর কিছুদিন আগে তার ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছে। এদিকে ক্যান্সারের চিকিৎসা ব্যয়ও প্রচুর। তাঁর পরিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সমাজের উচ্চ বিত্ত হৃদয়বান মানুষের কাছে সহযোগিতা কামনা করেছেন।

মোমিন আহমেদ চৌধুরীর এখন যে চিকিৎসা হবে তা প্রাথমিক এমনটা জানিয়ে চিকিৎসকেরা বলেছেন, এর মাধ্যমে টিউমারের সংক্রমণ কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। পরে শারীরিক অবস্থা ভালো হলে অপারেশন করানো হবে। সাধারণত হার্টের অপারেশন হলে তিন মাসের মধ্যে ডাক্তাররা কোনো ধরনের অপারেশন করাতে চান না। এই তিন মাসে তাকে কিছুটা রিকভারি করানোর চেষ্টা করা হবে। ক্যান্সার যেহেতু দ্রুত ছড়াচ্ছে তাই এটাকে নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা করা হচ্ছে।

চিকিৎসকরা আরও জানিয়েছেন, নিয়মিত চিকিৎসায় রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

ক্যান্সার ধরা পরার পর শারীরিক অবস্থা কেমন জানতে কথা হলে মোমিন আহমেদ চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, ১৮ জানুয়ারি আমার ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছে। ২৫ জানুয়ারি আমাকে রিলিজ দেওয়া হয়। এর থেকে বেশকিছু দিন আমার কোনো সমস্যা হয়নি, শারীরিক অবস্থা সব কিছু স্বাভাবিক ছিল। এরপর প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে রক্ত গেলে, হাসপাতাল থেকে আলট্রা সনোগ্রাম করানো হয়৷ সেখানে মূত্র থলিতে টিউমার ধরা পড়ে। পরে সেটা বায়োপসিতে পাঠালে প্রাথমিকভাবে ক্যান্সার শনাক্ত হয়। পরে আরও অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করানো হয় বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য। দুদিন আগেও একটি পরীক্ষা করানো হয়েছে।  

ক্যামোথেরাপি দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন জানিয়ে মোমিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ইতোমধ্যে একজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ আমায় দেখেছেন। তিনি আরও পরীক্ষা করবেন। তারপর আমার যেহেতু কার্ডিয়াক অপারেশন হয়েছে তাই সেটা বিবেচনায় রেখে শরীর কিছুটা ভালো হলে, পরে তারা ক্যামোথেরাপি দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেবেন।

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন ক্যান্সারের জীবাণু শরীরের ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে এমনটা জানিয়ে তিনি বলেন, শারীরিক অবস্থা বর্তমানে ভালো বলছেন না ডাক্তাররা। আমার ক্যান্সার মূত্রথলি থেকে শরীরের আরও অনেক জায়গায় ক্যান্সারের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা করছেন তারা।

এখন পর্যন্ত চিকিৎসায় কেমন খরচ হয়েছে জানতে চাইলে কিছুটা আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে মোমিন আহমেদ চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, এই ধরনের ক্যান্সার চিকিৎসা সাধারণত ব্যয়বহুল হয়। আমার চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত যে খরচ হয়েছে তা আমাদের সাধ্যের মধ্যে ছিল না। আত্মীয় স্বজনের এবং বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় চিকিৎসা সম্পন্ন হয়েছে। আমি একজন সাধারণ আইনজীবী। আমার আর্থিক সম্পদ তেমন নেই। কোনো রকম চলছে। আমার চিকিৎসার জন্য ইতোমধ্যে অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে। তবে ক্যান্সারের চিকিৎসা এখনো শুরু হয়নি, আর এতে কি পরিমাণ খরচ হবে তার সুনির্দিষ্ট পরিমাণ এখনো জানা যায়নি। তবে চিকিৎসকরা বলেছেন, এই ধরনের ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যয় অনেক হয় সাধারণত।

পরোপকারী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই মানুষটি যে জীবনের একটা সময় এসে এই অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে তা বুঝতে পারেননি। তাই একপ্রকার হতাশা ব্যক্ত করে মোমিন আহমেদ চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, একজন আইনজীবী হিসেবে জীবনে চেষ্টা করেছি সৎ থাকতে। আমি সরকারি আইনজীবী ছিলাম। নিজের জন্য জীবনে কিছু করতে পারিনি। বুঝতে পারিনি যে জীবনের একটা সময় এসে আমায় এই অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে। আমি সংসারের জন্য তেমন কিছু করে যেতে পারিনি। আমার তিন মেয়ে। বড় মেয়েটা শিক্ষক, মেঝ মেয়েটা ব্যাংকার আর ছোট মেয়েটা জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এখানে একটি স্কুলে শিক্ষকতা করে। বর্তমানে ছোট মেয়ে সাজিয়া আফরিন আমার দেখাশোনা করছে।  

মোমিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, আমার খোঁজ অনেকেই নিচ্ছেন। আমি সকলের কাছে কৃতজ্ঞ এবং আমার জন্য সকলে দোয়া করবেন। আমি বহু সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। জেলা আওয়ামী লীগের পদেও ছিলাম।  

মোমিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ক্যান্সারের চিকিৎসা করতে আমার শরীরের টিউমার অপারেশন করতে হবে। তবে এজন্য আগে ক্যামোথেরাপি দিয়ে ক্যান্সারটাকে নিয়ন্ত্রণ করে তারপর অপারেশন করাতে হবে। এর ফলে ঝুঁকির পরিমাণ কিছুটা কম হবে।  

কথা হয় মোমিন আহমেদ চৌধুরীর মেয়ে নাদিয়া চৌধুরীর সঙ্গে। পিতার বর্তমান শারীরিক অবস্থা বর্ণনা করে তিনি বাংলানিউজকে বলেন, বর্তমানে বাবার কোলনস্কপির তৃতীয় ধাপ সিগময়েটস্কপি হয়েছে। এটার রিপোর্ট এখনো আসেনি, কিছুদিন সময় লাগবে। এরপর প্যাডি স্কিন হবে। যাতে বিল আসতে পারে ৬৫ হাজার টাকার মতো। প্যাডি স্কিন হওয়ার পর ক্লোনলজিস্ট ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নেবেন পরবর্তী কি চিকিৎসা দেওয়া যায়।  

খরচ কমানোর জন্য চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিয়েছেন জানিয়ে নাদিয়া চৌধুরী বলেন, আমরা চাইলে আশেপাশে থেকে নিয়মিত চিকিৎসা নিতে পারব। হাসপাতালে যে থাকতে হবে বিষয়টা এমন না। শারীরিক অবস্থা যদি সব কিছু ঠিক থাকে তাহলে সামনের সপ্তাহে প্রথম ক্যামোথেরাপি দিতে পারে। তবে খরচের বিষয়ে এখনো তেমন কোনো ধারণা পাইনি।  

মোমিন আহমেদ চৌধুরীর শয্যার পাশে টানানো একটি পোস্টারে চিকিৎসার জন্য আর্থিক সাহায্যের কথা লেখা ছিল। জানা গেছে তারই বন্ধু চিকিৎসক এম এ খালেক শয্যার পাশে এটি লাগিয়েছিলেন। টানানো পোস্টারে লিখা ছিল, ‘জয়পুরহাটের কৃতী সন্তান, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোমিন আহমেদ চৌধুরী দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত। তাঁর চিকিৎসার জন্য আর্থিক সাহায্যে এগিয়ে আসুন। ’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সমসাময়িক নানা বিষয়ে বুদ্ধিদীপ্ত লেখালেখির পাশাপাশি জয়পুরহাটে জনসাধারণের কাছে পরোপকারী হিসেবে পরিচিত মোমিন আহমেদ। দরিদ্র, আর্ত ও পীড়িত কখনোই তাঁর দ্বার থেকে শূন্য হাতে ফিরে যায়নি। নিজের চরম অর্থসংকটের সময়ও তিনি ঋণ নিয়ে পরোপকার করেছেন।

মোমিন আহমেদ চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পেশায় তিনি একজন আইনজীবী। ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে সিদ্ধেশ্বরী, শান্তিনগর, মালিবাগ এলাকায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, সিদ্ধেশ্বরী হাই স্কুল শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৬৮ সালে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের কার্যনির্বাহী সদস্য, ১৯৭০ সালে জয়পুরহাট মহকুমা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ১৯৭২ সালে জয়পুরহাট মহকুমা ছাত্রলীগের সহসভাপতি এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন। ১৯৮৪ সালে যোগ দেন আওয়ামী লীগে। পরবর্তী কাউন্সিলে জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ৯০ দশকের পর এ পর্যন্ত জয়পুরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৯২-৯৩ সালে জয়পুরহাটে ঐতিহ্যবাহী জয়পুরহাট জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি পাঁচবার আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

মোমিন আহমেদ চৌধুরী জয়পুরহাট ডায়াবেটিস সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতি হিসেবে ডায়াবেটিস আক্রান্ত অসহায় মানুষের চিকিৎসাসেবায় কাজ করছেন। তিনি রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক, বর্তমানে সহ-সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়ে অসহায় দুঃস্থ মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। জয়পুরহাট জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহ-সভাপতি হিসেবে জয়পুরহাটে খেলার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এরমধ্যে তিনি ৭০-এ পদার্পণ করেছেন।

সারা জীবন মানুষের সেবা করে এসে নিজের চিকিৎসা নিয়ে এভাবে বিপন্ন হতে হবে ভাবেননি মোমিন আহমেদ চৌধুরী। তিনি চিকিৎসার মাধ্যমে বাঁচার সুযোগ চান। তাঁর পরিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সমাজের উচ্চ বিত্ত হৃদয়বান মানুষের কাছে সহযোগিতা কামনা করেছেন।

বাংলাদেশ সময়: ১৩০২ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৪
ইএসএস/এসআইএস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।